মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের বাজার আবার লাগামহীন। গত তিন দিনের ব্যবধানে কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকায়। আড়তদাররা বলছেন, মোকামের ব্যাপারীরা সিন্ডিকেট করে পকেট কাটছেন ভোক্তাদের। খুচরা বিক্রেতারাও সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন। তারা বলছেন, পাইকারি বাজারেই প্রতিদিন দাম বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে দেশি পেঁয়াজের চাহিদা বেশি কিন্তু সরবরাহ কম। এ ছাড়া নতুন মৌসুমে পেঁয়াজ এখনো বাজারে আসেনি। দেশে ভারতীয় পেঁয়াজের আমদানিও বন্ধ রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবসায়ীরা বলছেন, দ্রুত আমদানির অনুমতি না দিলে দাম আরও বাড়বে। সাধারণ মানুষ অভিযোগ করছেন, মোকামের সিন্ডিকেটের কারণে পেঁয়াজের দাম অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম হঠাৎ করেই বৃদ্ধি ভোক্তাদের দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। পাইকারি ও খুচরা বাজারে দামের প্রভাব লক্ষ করা গেছে।
পাইকারি বাজারে প্রতিদিন দাম বাড়ার বিষয়ে শ্যামবাজারের পেঁয়াজ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও শ্যামবাজার কৃষিপণ্য আড়ত বণিক সমিতির সহসভাপতি মো. মাজেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা ব্যবসা করি। কমিশন পাই প্রতি কেজিতে মাত্র ৮০ পয়সা। মোকাম থেকেই দাম বেঁধে দেয়। সেই দামে বিক্রি করতে রাজি না হলে পেঁয়াজ পাঠায় না সিন্ডিকেট চক্র বা ব্যাপারীরা। বাড়তি দামের যা লাভ সবই ব্যাপারীদের পকেটে যায়। তাই তাদের ধরলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কারণ তারাই মোকাম থেকে পাঠাচ্ছেন পেঁয়াজ। আমাদের ৩০০টির বেশি আড়ত রয়েছে। সবার অবস্থা ও সিস্টেম একই। ভোক্তাদের সচেতন হতে হবে। দেখা যায় দাম বাড়লেই বেচাকেনার ধুম লেগে যায়। তাই অনেক বেশি করে কিনতে শুরু করেন ভোক্তারা। এটা বন্ধ করতে হবে।’
কৃষিসচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান খবরের কাগজকে বলেন, ‘হঠাৎ করে পেঁয়াজের দাম বাড়ায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তর মাঠে কাজ করছে।’ তারা বলছেন, ‘কয়েক দিন আগে হঠাৎ বৃষ্টি হওয়ায় পেঁয়াজের সরবরাহ কমে যায়। এ জন্য দাম বাড়ে। তবে দেশে চাহিদার তুলনায় বেশি পেঁয়াজ রয়েছে। এ ছাড়া ১৫ দিনের মধ্যে নতুন পেঁয়াজও উঠে যাবে। কাজেই বাজার সহনশীল হলে কোনো কথা নেই। আর যদি দেখি ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন, দাম বাড়াচ্ছেন, তাহলে দু-এক দিনের মধ্যেই পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে।’
বাজারে যেসব কর্তৃপক্ষ অভিযান পরিচালনা করে তাদের মতে, বাজারের কারসাজি হলে অবশ্যই অভিযান পরিচালনা করা হবে। কেউ অনৈতিক কাজে জড়িত থাকলে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। কর্তৃপক্ষ মনে করে, দেখার বিষয় আসলে পেঁয়াজের মজুত শেষ পর্যায়ে, না সিন্ডিকেট কারসাজি করে দাম বাড়াচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয় সঠিক উৎপাদনের পরিমাণ বলতে পারবে। অর্থাৎ কী পরিমাণ মজুত আছে। চাহিদার তুলনায় কম থাকলে সরকারকে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিতে হবে। তবেই বাজার স্থিতিশীল হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, সারা দেশে ২৬ থেকে ২৭ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। গত মৌসুমে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছে ৩৮ লাখ টন। তবে উৎপাদন-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে প্রতি বছর পেঁয়াজের ২৫ শতাংশের বেশি নষ্ট হয়। এ কারণে ৬-৭ লাখ টন পেঁয়াজ প্রতিবছর আমদানি করতে হয়।
চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ভালো থাকলেও ব্যবসায়ীরা তা মানতে নারাজ। আবার কেউ কেউ বলছেন, কিছু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে পেঁয়াজ মজুত করে অল্প অল্প করে বাজারে ছাড়ছেন। দেশে পেঁয়াজের ঘাটতি রয়েছে কি না বা ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন কি না, এ ব্যাপারে বাজার বা মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে মোকামের সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি ভোক্তা সচেতনতা বাড়াতে হবে। আশা করছি, পেঁয়াজের বাজারদর নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত আমদানির অনুমতি দিলে দেশে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমে আসবে।

