বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, দেশের সব নীতি নির্ধারণ করছে উন্নয়ন সহযোগী তথা বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা ও আইএমএফ। তাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আমাদের আমলাতন্ত্র আর ব্যবসায়ীরা। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার আমলে যারা সিদ্ধান্ত নিত, ইউনূস আমলেও তারাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। বুধবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীর প্রেস ইনস্টিটিউটে নাগরিক উদ্যোগের আয়োজনে এলডিসি উত্তরণ নিয়ে এক সেমিনারে এ কথা বলেন আনু মুহাম্মদ। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।আনু মুহাম্মদ বলেন, উন্নয়ন সহযোগীরা শেখ হাসিনার উন্নয়ন মডেলকে মিরাকল বা অলৌকিক বলেছিল। তারা আলাদা উন্নয়ন ধারা তৈরি করেছিল। এখন তারাই আবার নীতি নির্ধারণ করছে। উপদেষ্টারাও বিদেশিদের জন্য নীতি নির্ধারণে বেশি উৎসাহী।গোপন চুক্তি নিয়ে আনু মুহাম্মদ বলেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে জনগণকে জানাতে হবে। এটাই মুক্তবাজার অর্থনীতির নীতি। গোপন চুক্তি না করে এ সরকারের পরিবর্তনের দিশা তৈরির সুযোগ ছিল। তারা আগের গোপন চুক্তিগুলো প্রকাশ করতে পারত, যাতে পরের সরকারগুলো এমন চুক্তি করতে উৎসাহী না হয়। কিন্তু এসব বিষয়ের কোনো পরিবর্তন হয়নি, বিষয়টি আশা ভঙ্গের।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আক্তার বলেন, ‘এলডিসি উত্তরণ করা বা বিলম্ব করার বিষয়ে এখনো সরকারের সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ এখনো এ জন্য প্রস্তুত নয়, যদিও আমরা আগের পরিসংখ্যান বয়ে বেড়াচ্ছি। নতুন সরকার হয়তো উত্তরণ করবে। আমরা নিয়মের মধ্যে কিছু প্রস্তুতি নিচ্ছি মাত্র।’মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়ে প্রধান অতিথি বলেন, এফটিএ মানে ফোর্স ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট বা জোরপূর্বক বাণিজ্য চুক্তি, এটা ছাড়া কোনো অর্থ হয় না। সেমিনারে এলডিসি উত্তরণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।এলডিসি উত্তরণে পুরোপুরি প্রস্তুত নয় বাংলাদেশ: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছেন, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে রয়েছে, কিন্তু এই পদক্ষেপটি আমরা গত সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উত্তরাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছি।তিনি বলেন, ‘গত সরকারের সময়ে প্রকাশিত জিডিপি, ব্যক্তিগত আয়, মাতৃস্বাস্থ্য ও অন্যান্য সামাজিক সূচক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। বাস্তবিক অর্থে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।’
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পরিসংখ্যান বহন করলেও তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। ২০২৬ সালের নভেম্বরে আমাদের দেশের উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা গ্রহণের সময় আসবে এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে সে অনুযায়ী নিয়ম মেনে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।তিনি বলেন, ‘এলডিসি উত্তরণের ফলে শুল্ক ও জিএসপি সুবিধার প্রভাব কোথায় বাড়বে এবং কোথায় কমবে তা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে নানান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।’তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘বিদেশ থেকে স্বল্পমূল্যে গরুর মাংস আমদানি করলে দেশীয় গবাদিপশুর বাজারে প্রভাব পড়বে এবং লাখ লাখ খামারি, বিশেষ করে গরিব নারীরা যারা গরু লালন-পালন করে উদ্যোক্তা হিসেবে অবদান রাখছেন, তাদের ক্ষতি হবে।’উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা বিদেশ থেকে মাংস আমদানি কমানোর জন্য চেষ্টা করছি। কারণ আমদানি করা মাংসের মাধ্যমে জুনোটিক রোগ প্রবেশের ঝুঁকি রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, সাগরের স্কুইড ও কুচিয়া রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ হিসেবে আমদানি হ্রাস করতে এবং দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।সভায় আরও বক্তব্য দেন, থার্ড ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্কের জেনেভাভিত্তিক লিগ্যাল অ্যাডভাইজার ও সিনিয়র রিসার্চার সানিয়া রিড স্মিথ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. জাহেদ মাসুদ ও অ্যাডভোকেট তাসলিমা জাহান। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নাগরিক উদ্যোগের কো-অর্ডিনেটর বারাকাত উল্লাহ মারুফ।

