রাজধানীর ব্যস্ত নগরীতে সবুজ বিলীন হতে চলেছে। নগরীর মাঝখানে মানুষের বিশ্রাম ও বিনোদনের প্রিয় স্থানগুলোও কংক্রিটে চাপা পড়ছে। ঢাকার ‘ফুসফুস’ খ্যাত ওসমানী উদ্যানও হারিয়ে যাচ্ছে কংক্রিটের আড়ালে আর অব্যবস্থাপনার দমবন্ধ বাস্তবতায়। এ ছাড়া উন্নয়নের জন্য সেখানে প্রকল্পের কাজ চলমান, যা নিয়ে আপত্তি আছে পরিবেশবাদীদের। নিয়ম অনুযায়ী কোনো পার্ক বা উদ্যানের ৫ শতাংশের বেশি অবকাঠামো নির্মাণ করা উচিত নয়। ওসমানী উদ্যানের ক্ষেত্রে এ নিয়ম মানা হয়নি; বরং উদ্যানটির ২৩ শতাংশের বেশি স্থানে অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এটি খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০-এর পরিপন্থি। নাগরিকরা বলছেন, ওসমানী উদ্যানে যেন সত্যিকারের উন্নয়ন হয়, যে উন্নয়নে ফিরবে গাছ, ফুল, সবুজ আর ইতিহাসের মর্যাদা। তা না হলে এই ঢাকার ফুসফুস একদিন পুরোপুরি নিশ্বাস নিতে ভুলে যাবে।
ওসমানী উদ্যান কেবল একটি পার্ক নয়, বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থান, যা ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীর নামে নামকরণ করা হয়। কিন্তু বর্তমানে উদ্যানটি অযত্ন-অবহেলায় এর ঐতিহাসিক ফলক, স্মৃতিস্তম্ভ ও স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া খোঁড়াখুঁড়ির কারণে গাছের গোড়া ধ্বংস হচ্ছে এবং অসংখ্য গর্ত তৈরি হচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে উন্নয়নকাজ করার ফলে উদ্যানের মূল চরিত্র পাল্টে গেছে। একসময়ে ওসমানী উদ্যানের আয়তন ছিল প্রায় ২৪ একর, যা বর্তমানেও নির্মাণ প্রকল্প ও রাস্তা সম্প্রসারণের কারণে হ্রাস পেয়েছে। সবুজ গাছপালা কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ায় পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মতে, রাজধানীর মাঝখানে এত বড় সবুজ এলাকা হারিয়ে গেলে ঢাকার তাপমাত্রা ও দূষণ উভয়ই বাড়বে।
ওসমানী উদ্যানে সাধারণ নাগরিকের প্রবেশ নিষেধ ২০১৮ সাল থেকে। টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখায় সেখানে বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রম চলছে। উন্নয়নকাজের ধীরগতিতে একদিকে নাগরিক সুবিধা হারিয়েছেন মানুষ, অন্যদিকে উদ্যানটি অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এতে অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। খবরের কাগজের সরেজমিন তথ্যমতে, উদ্যানের প্রবেশমুখেই বসেছে চা-সিগারেটের দোকান। যেগুলোর আড়ালে চলে মাদক বিক্রি। সেখানে বসে থাকে দল বেঁধে মাদকসেবী। রাত নামলে সেখানে চলে মাদকসেবীদের আড্ডা, কিশোর গ্যাংয়ের আনাগোনা, এমনকি দেহ ব্যবসার মতো অনৈতিক কাজও সেখানে চলছে। সাধারণ নাগরিকরা ভয়ে উদ্যানে ঢুকতে পারেন না। এমনকি পুলিশও এ ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ বলেন, একটি জাতীয় উদ্যান দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে আছে। সঠিক পরিকল্পনা না করে অপরিকল্পিতভাবে এগোনোর কারণে উন্নয়নের নামে উদ্যানের মূল চরিত্র পাল্টে দেওয়া হয়েছে। ফলে এ উদ্যান ব্যবহারের অনুপযোগী করে রাখা হয়েছে। উদ্যানের প্রকল্পের ডিজাইন কখনোই জনসাধারণের সামনে প্রকাশ করা হয় না। আমরা মনে করেছিলাম অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উদ্যানের কাজ দ্রুত সেরে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে দেখতে পাচ্ছি তা করা হয়নি।
ওসমানী উদ্যান রক্ষায় অতীতে দেশে বেশ কয়েকবার আন্দোলন হয়েছে। দেশপ্রেমিক নাগরিকরা সোচ্চার থেকেছেন, তবু থেমে থাকেনি এর ধ্বংসযজ্ঞ। কোনো পার্ক বা উদ্যান ধ্বংস করে কংক্রিটের স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা কোনোমতেই কাম্য নয়। নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি ও পরিবেশবাদীরা বলছেন, বিধি অনুযায়ী যতটুকু অবকাঠামো নির্মাণ করা দরকার ছিল, তার থেকেও অনেক বেশি হয়েছে। আমরা চাই সবুজ ধ্বংস করে উন্নয়ন আর নয়। ঢাকার ‘ফুসফুস’ ওসমানী উদ্যান রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

