এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) এক বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পাওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও ৩৫ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাওয়া এ সহায়তার ফলে রিজার্ভে নতুন গতি ফিরেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ জুন পর্যন্ত দেশের মোট (গ্রস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ হিসাবপদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।
এর আগে গত ১০ জুন দেশের মোট রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।
তবে অর্থনীতিবিদেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, মোট রিজার্ভের পুরোটা ব্যবহারযোগ্য নয়। স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক দায় ও অন্যান্য বাধ্যবাধকতা বাদ দিয়ে যে নিট বা ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হিসাব করা হয়, সেটিই প্রকৃত অর্থে অর্থনীতির সক্ষমতার নির্দেশক।
বাংলাদেশ ব্যাংক অভ্যন্তরীণভাবে ‘ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ’ হিসাব করে থাকে। এতে আইএমএফের বিশেষ ড্রয়িং অধিকার (এসডিআর), ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ক্লিয়ারিং হিসাব এবং আকুর বিলের মতো কিছু দায় বাদ দেওয়া হয়। যদিও এ হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয় না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় বিবেচনায় নিলে, এ রিজার্ভ দিয়ে সাড়ে পাঁচ মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতাসম্পন্ন রিজার্ভকে নিরাপদ ধরা হয়।
একসময় রিজার্ভের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। তখন ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ১৪ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ডলার সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালের আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল। সে সময় প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা ২০ পয়সা। তবে পরবর্তী সময়ে ঋণখেলাপি বৃদ্ধি, আর্থিক খাতের অনিয়ম এবং অর্থপাচারের মতো বিভিন্ন কারণে রিজার্ভে চাপ তৈরি হয় এবং তা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় দেশের মোট রিজার্ভ নেমে আসে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী তখন তা ছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা দেখা দেয় এবং ডলারের বিনিময় হার ১২০ টাকার বেশি হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমদানিতে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ধীরে ধীরে ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা হয়। একই সঙ্গে প্রবাসী আয় বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং আমদানির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ ধাপে ধাপে শিথিল করা হয়। তুলনামূলক উদার বাণিজ্য নীতির ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পায়, যা রিজার্ভ পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের মোট রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার। বিপিএম-৬ হিসাবপদ্ধতিতে তখন রিজার্ভের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক সহায়তা, প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং স্থিতিশীল মুদ্রাবাজার ধরে রাখতে পারলে আগামী দিনগুলোতে রিজার্ভ আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পারে।

