যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের মিত্রতা থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে কানাডা। বেইজিং সফরে গিয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে নতুন এক ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কার্নি বলেন,
‘আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যে বহুমাত্রিক চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় কানাডা ও চীন একসঙ্গে কাজ করতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, অতীত সম্পর্কের ইতিবাচক দিকগুলোকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই একটি নতুন অংশীদারত্ব গড়ে তোলা সম্ভব।
বাণিজ্য বিরোধে অগ্রগতি
বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) ওপর আরোপিত শুল্ক শিথিল করতে যাচ্ছে কানাডা। একই সঙ্গে চলতি বছরের মধ্যেই চীন কানাডার ক্যানোলা বীজসহ কয়েকটি কৃষিপণ্যের ওপর আরোপিত উচ্চ শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে বলে আশা প্রকাশ করেছে অটোয়া। দীর্ঘদিনের বাণিজ্য বিরোধ প্রশমনের পথে এটিকে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিনিয়োগ ও বাজার প্রবেশের সুযোগ
কানাডার পক্ষ থেকে জানানো হয়, সর্বোচ্চ ৪৯ হাজার চীনা ইভি দেশটির বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে, যেখানে শুল্ক নির্ধারিত হবে ৬ দশমিক ১ শতাংশ। এর ফলে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে আরোপ করা ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যত প্রত্যাহার করা হলো। এতে কানাডার অটোমোবাইল খাতে চীনা যৌথ বিনিয়োগ বাড়বে বলেও আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে চীন কানাডার ক্যানোলা বীজের ওপর শুল্ক প্রায় ৮৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারে। একই সময়ে লবস্টার ও মটরশুঁটির মতো অন্যান্য কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেও শুল্কছাড় কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের ক্যানোলা বাজারে আবার প্রবেশের সুযোগ পাবে কানাডা।
ট্রাম্প ফ্যাক্টর ও কূটনৈতিক মোড়
২০১৭ সালের পর এই প্রথম কোনো কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করলেন। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে হুয়াওয়ের শীর্ষ নির্বাহী মেং ওয়ানঝুকে গ্রেপ্তারের পর কানাডা–চীন সম্পর্ক তলানিতে ঠেকে। পরে চীনে দুই কানাডীয় নাগরিক আটক হওয়ার ঘটনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাম্প্রতিক বিরোধ কানাডাকে নতুন কৌশল গ্রহণে বাধ্য করেছে। কানাডার পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের পাশাপাশি দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ বানানোর মন্তব্য অটোয়ায় ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
বেইজিংয়ের বার্তা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও ‘নতুন ধরনের কৌশলগত অংশীদারত্ব’ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। উভয় দেশ কৃষি, জ্বালানি, পরিষ্কার প্রযুক্তি ও কাঠজাত পণ্যে বিনিয়োগ বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে চীনে কানাডার রপ্তানি ৫০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
তবে এই সম্পর্কোন্নয়ন এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন নির্বাচনী বিতর্কে মার্ক কার্নি নিজেই চীনকে কানাডার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। ফলে বেইজিংয়ের সঙ্গে নতুন করে ঘনিষ্ঠতা কতটা টেকসই হবে—তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

