যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের দেশগুলোর দীর্ঘদিনের জোটটি কি আসেলেই ভাঙনের মুখে পড়ছে কিনা তা নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে এমন প্রশ্ন সামনে এসেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড বিষয়ক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয়টি প্রতিভাত হওয়ার পর। এমনকি স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তি উপেক্ষা করে তিনি দ্বীপটি অধিগ্রহণের চেষ্টা র বিষয়টিকে জোরদার করছেন যেন ক্রমশ। অন্যদিকে ইউরোপীয় নেতারা এ বিষয়টির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানের মত স্পষ্ট করেই জানিয়ে আসছেন।
ইউরোপের নেতাদের মধ্যে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ও জার্মানির অর্থমন্ত্রী লার্স ক্লিংবাইলকে দেখে মনে হচ্ছে তারা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির জবাব হিসেবে তারা ইউরোপের দেশগুলোকে একটি অর্থনৈতিক দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। চলতি সপ্তাহে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন ইউরোপের নেতারা। ধারণা করা হচ্ছে, সেখান থেকে তারা ট্রাম্পের উসকানির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাবেন।
তবে দীর্ঘদিনের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে এমন পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ ও প্রতিক্রিয়া আগে কখনও দেখা যায়নি। এখন ইউরোপ প্রকৃত অর্থেই ট্রাম্পের ভূখণ্ড দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে দাঁড়ালে জোটে ক্ষত তৈরি হবে। সেই ক্ষত সারাতে ভবিষ্যতে কতদিন সময় লাগবে- এমন প্রশ্নও তৈরি হচ্ছে। কারণ, বিবাদ থাকা মানেই, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়া। যেমন- ট্রাম্প এরই মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরুর হুমকি দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রহীন পশ্চিমা জোট ও বাস্তবতার দিকসমূহ
ইউরোপীয় রাজনীতির অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র জোট ইতোমধ্যেই মৌলিকভাবে বদলে গেছে। ট্রাম্প আমলে ‘সবাই সবার তরে’- এমন নীতি ভেঙে গেছে। বরং ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রভাব ব্যবহার করছেন, আর ইউরোপীয়দেরকে সেটির সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাধ্য করছেন।
গবেষণা সংস্থা জার্মান মার্শাল ফান্ডের ব্রাসেলস কার্যালয়ের প্রধান ইয়ান লেসার বলছেন, মিত্রদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধের মতো পথ বেছে নেওয়ার ঘটনা এর আগে কখনও দেখা যায়নি।
প্রশ্ন হলো, ইউরোপের পক্ষ থেকে এই অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশ নেওয়ার মতো বাস্তবতা কি আছে? বর্তমানে ইউরোপ অনেকাংশে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। তারা যদি নতুন আর্থিক ও সামরিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেও, সেটি বাস্তবায়ন হতে বেশ কয়েক বছর সময় লাগবে। অন্যদিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইউক্রেন মার্কিন অস্ত্রের বাজার থেকে মুখ ফেরাতে পারবে না। ইউরোপের বাকি দেশগুলো এরই মধ্যে কিয়েভকে সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি তাদের মধ্যে কূটনৈতিক যে আলোচনাগুলো হয়েছে সেটি দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া, ইউরোপ বা ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো রাশিয়ার আগ্রাসন বন্ধে প্রায় অক্ষম।
ইয়ান লেসার বলছেন, ইউরোপে এখন যুদ্ধ চলছে। এ অবস্থায় জোটের কৌশলগত সুবিধা নেওয়া বন্ধ করে দেওয়াটা বোকামি হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যদি জোট থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে ইউরোপকে অবশ্যই বিকল্প কিছু করতে হবে।
দূরত্ব দৃশ্যমান
ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে ইউরোপের মিত্রদের প্রতি তাচ্ছিল্যের মনোভাব প্রকাশ করেছেন। গত মাসে বার্ষিক জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্র প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে মার্কিন কর্মকর্তারা সংশয় প্রকাশ করে বলেন, কিছু ইউরোপীয় দেশ ভবিষ্যতে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে নাও থাকতে পারে। কৌশলপত্রটিতে স্বীকার করা হয়েছে যে, ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি একই মতাদর্শের (কট্টর ডানপন্থী) দলগুলোকে ক্ষমতায় যেতে সহায়তা না করে, তাহলে মহাদেশটি বিচ্ছিন্ন হওয়ার শঙ্কা তৈরি হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, একদিকে ইউরোপকে নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা সংশয় প্রকাশ করছেন, অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প সহজ বা কঠিন যেকোনো উপায়ে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের হুমকি দিচ্ছেন। দুইয়ে মিলে জোটের কয়েক দশকের বিশ্বাসের ভিত্তি ক্ষয়ে যেতে শুরু করেছে। থিংক ট্যাংক কার্নেগি ইউরোপের পরিচালক রোজা বালফোর বলছেন, এখন বিশ্বাসের আগের পর্যায়ে ফিরে যেতে হলে প্রজন্মগত পরিবর্তন দরকার।
গ্রিনল্যান্ড ঘিরে ট্রাম্পের সবশেষ হুমকির প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপের অনেক নেতা আওয়াজ তোলা শুরু করেছেন। এক বিবৃতিতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাখোঁ বলেছেন, ‘কোনো ভয় বা হুমকি তাদের প্রভাবিত করতে পারবে না।’ মাখোঁ শুল্ক হুমকিকে অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি বাস্তবায়িত হলে ইউরোপীয়রা ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিতভাবে জবাব দেবে।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মতো কয়েকজন নেতা কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে তাদের যুক্তি তিলে ধরেছেন।
এ প্রসঙ্গে বালফোর বলছেন, ইউরোপের কিছু নেতা বুঝতে পারছেন যে, ট্রাম্পকে ছাড় দেওয়া হলে, তিনি আরও ছাড় দাবি করেন। এতদিন যেসব নেতা সতর্কতামূলক অবস্থান নিয়েছেন, তারাও এই বাস্তবতা বুঝতে পারছেন। ফলে ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র জোটের মধ্যে দূরত্ব স্পষ্ট হচ্ছে।

