সেনা সদর দপ্তর আইন প্রয়োগ না করা পর্যন্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি মামলার আসামি ২৫ সেনা কর্মকর্তার মধ্যে ১৫ জন এখনো কর্মরত বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। রবিবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে ট্রাইব্যুনালের প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ কথা জানান। সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন ছিল- ‘আপনি সেনা কর্মকর্তাদের সার্ভিং বলেছেন। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের সংশোধিত আইনে ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হলেই চাকরি থাকার কথা নয়। তাহলে চার্জশিটভুক্ত আসামি সেনা কর্মকর্তারা চাকরিচ্যুত নাকি চাকরিরত, কোনটা বলা হবে?’ উত্তরে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম বলেন, ‘যেটা আইনে বলা আছে, সেটাই আইনের ব্যাখ্যা। এখন সেনা সদর দপ্তর সিদ্ধান্ত নেবে যে আইনটি কবে তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হবে। যতক্ষণ প্রয়োগ না করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তো সার্ভিং (কর্মরত) বলা যেতে পারে।’
সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলার দুটি হচ্ছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত গুম-খুন-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা। এর মধ্যে একটি মামলায় ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে। অপরটির তদন্ত চলমান। অন্য মামলাটি দায়ের হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায়। দাখিল করা চার্জশিটে ২৫ জন সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ সেনা কর্মকর্তা এখনো কর্মরত। ১ জন এলপিআরে (অবসরোত্তর ছুটিতে) আছেন, অপর ৯ জন অবসরে।
২০ নয় ২৩ নভেম্বর হাজির করতে হবে
গুম-নির্যাতনের দুটি মামলার পরবর্তী শুনানি ছিল ২০ নভেম্বর। সেই দিন কারাবন্দি সেনা সদস্যদের হাজিরা নির্ধারিত ছিল। তবে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তারিখটি পরিবর্তন করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুযায়ী আগামী ২৩ নভেম্বর তাদের হাজির করতে হবে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে প্রসিকিউটর মোনাওয়ার হুসাইন তামীম বলেন, দুটি মামলার পরবর্তী তারিখ ছিল যথাক্রম ৫ ও ২০ নভেম্বর। গতকাল প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়। প্রসিকিউশনের নিজস্ব জটিলতার (ডিফিকাল্টি) কারণে সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয় বলে সাংবাদিকদের জানান প্রসিকিউটর তামীম। আবেদন মঞ্জুর করে ৫ নভেম্বর ধার্য থাকা দিনটি পরিবর্তন করে ২৪ নভেম্বর এবং ২০ নভেম্বর ধার্য থাকা দিনটি পরিবর্তন করে ২৩ নভেম্বর নির্ধারণ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। নতুন আদেশে ২৪ নভেম্বর ধার্য হওয়া মামলাটিতে দুজন সেনা কর্মকর্তা ও ২৩ নভেম্বর ধার্য হওয়া মামলাটি অপর সেনা কর্মকর্তারা আসামি রয়েছেন। আসামির তালিকায় মোট ২৫ সেনা কর্মকর্তার মধ্যে ১৫ জনকে সেনা হেফাজতে গত ২২ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। ওই দিন সেনা কর্মকর্তাদের কারাগারে বন্দি রাখার নির্দেশ দেন। সেই থেকে সেনা কর্মকর্তারা ক্যান্টমেন্টের উপ-কারাগারে বন্দি আছেন।
গুমের আরেক মামলায় জিয়াউলের হাজিরা
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানকে গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ হাজির করা হয়েছিল। প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ মামলায় জিয়াউলসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় বাড়িয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। আদেশে আগামী ১১ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
মামলাটির ১১ আসামির মধ্যে ৪ জনের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। তারা হলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান। এর মধ্যে শুধু জিয়াউল আহসান গ্রেপ্তার হয়েছেন।
প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম বলেন, গুমের অভিযোগসংবলিত এই বিবিধ মামলা (মিস কেস) অনেক দিন ধরে চলছে। গুমের অভিযোগসংবলিত মামলায় ইতোমধ্যে দুটি ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়েছে। এতে ২৫ সাবেক-বর্তমান সেনা কর্মকর্তাসহ ২৮ জনকে আসামি করা হয়েছে, আরেকটি অংশের তদন্ত চলছে। সেই তদন্তও শেষ পর্যায়ে আছে। এ মামলায় কিছু আসামির নাম ওই দুটি মামলায় (অভিযোগপত্র দাখিল করা) আসামি হিসেবে চলে এসেছে। তাই তাদের নাম এই মামলায় যুক্ত করা হবে না।

