অতিরিক্ত লাভের প্রতিযোগিতা ব্যাংক কর্মকর্তাদের মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত করছে
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত আজ এমন এক ভয়াবহ প্রতিযোগিতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সীমাহীন মুনাফা অর্জন। ব্যাংকের মালিকপক্ষ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের এখনই উচিত একটি সহনীয় ও ন্যায্য মুনাফার সীমা (profit margin) নির্ধারণ করা, যাতে ব্যাংকগুলো অনৈতিকভাবে অতিরিক্ত মুনাফার দৌড়ে কর্মসংস্থান সংকোচন ও মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি না করে।
একটি ব্যাংক বছরে হাজার কোটি টাকা লাভ করবে — এটি অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু সেই মুনাফার জন্য যদি শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বেকার বানাতে হয়, তাহলে সেটি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ সংকেত। ব্যাংকের মুনাফা মানেই যেন কারও চাকরিহানি নয়, এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হওয়া উচিত।
“টার্গেটই জীবন” — এই মনোভাব এখন বিপজ্জনক
বর্তমান ব্যাংকিং সংস্কৃতিতে “টার্গেট পূরণ” যেন জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। এই সংস্কৃতি ব্যাংক খাতে ভয়াবহ মানসিক চাপ, অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা ও অনৈতিক আচরণ তৈরি করছে। প্রতিদিনের টার্গেট, সাপ্তাহিক রিপোর্ট, মাসিক প্রেশার — সব মিলিয়ে ব্যাংকারদের একাংশ এখন মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্লান্ত, হতাশ ও অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
যে খাতে দেশের অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন হয়, সেই খাতের কর্মীদের যদি ক্রমাগত মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে হয়, তাহলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়ে। অতিরিক্ত মুনাফার এই মানসিকতা এখনই নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন।
টার্গেটে ব্যর্থতা মানেই অযোগ্যতা নয়
যেসব কর্মকর্তা বা কর্মী টার্গেট পূরণে পিছিয়ে পড়ছে, তাদের সরাসরি চাকরি থেকে বাদ না দিয়ে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও বিভাগ পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া উচিত। প্রত্যেক কর্মীই প্রতিষ্ঠানের সম্পদ। তাদের হারিয়ে ফেলা মানে বিনিয়োগ হারানো।
অন্যদিকে, দুর্নীতি, অসততা বা বেআইনি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে—এ নিয়ে কোনো ছাড় নেই। কিন্তু শুধুমাত্র টার্গেট পূরণ না হওয়ার অজুহাতে কাউকে চাকরিচ্যুত করা মানবিকতা ও ন্যায়বোধের পরিপন্থী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত দায়িত্ব
বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত এখনই ব্যাংক খাতে মুনাফার সীমা ও মানবিক নীতি নির্ধারণে কার্যকর নির্দেশনা দেওয়া। প্রতিটি ব্যাংকের জন্য একটি সহনীয় লাভের হার নির্ধারণ করতে হবে, যার বাইরে গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
একইসঙ্গে, ব্যাংকের সকল কর্মীকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্ম–সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। কারণ, ব্যাংক খাতের শক্তি কেবল মূলধনে নয়, বরং দক্ষ ও নৈতিক কর্মীবাহিনীতে।
নৈতিক ব্যাংকিং–ই টেকসই ব্যাংকিং
অতিরিক্ত মুনাফার লোভে মানবিকতা বিসর্জন দিলে, তা ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন নৈতিক ও মানবিক ব্যাংকিং নীতি, যেখানে মানুষ থাকবে মুনাফার আগে।
বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক মালিক ও পরিচালনা পর্ষদ—সবাইকে এখনই এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। নতুবা ভবিষ্যতে ব্যাংক খাত কেবল সংখ্যার জালে আবদ্ধ হয়ে মানবিক সংকটে পতিত হবে।
✍ লেখক: শেখ মোহাম্মদ জায়েদ আল ফাত্তাহ
ব্যাংকার, অর্থনীতি বিশ্লেষক ও নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক প্রতিকার পাতা
(লেখাটি লেখকের নিজস্ব মতামত)

