যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। ইতোমধ্যে এ সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ এবং আর্থিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে যে, চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্য, যা বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, সেখানে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য প্রতি ব্যারেল মূল্য ১০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।
ঢাকা চেম্বারের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ অবস্থানে থাকলে তা বাংলাদেশের বহিঃখাতের ওপর বেশ চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বৃদ্ধি পাবে এবং বাণিজ্য ঘাটতি সম্প্রসারিত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বিশেষত হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন ব্যবস্থাতেও প্রভাব ফেলছে।
উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। এই রুটে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কোনো বিঘ্ন দেখা দিলে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে ফ্রেইট চার্জ, বীমা প্রিমিয়াম এবং পণ্য সরবরাহের সময়সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের রফতানিমুখী শিল্পখাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, এই পরিস্থিতিতে উচ্চ লজিস্টিক ব্যয়, সাপ্লাই চেইন বিঘ্ন এবং সমুদ্রপথে পরিবহনে বাড়তি ঝুঁকির সম্মুখীন। এছাড়া, আমাদের স্থানীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে গত ৭ মাসে রফতানি কমতে কমতে প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। ডিসিসিআইয়ের মতে, সংঘাতের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেলে আমদানি ও রফতানি উভয় ক্ষেত্রেই ব্যয় আংশকাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বৈশ্বিক এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও এলএনজি, এলপিজি, ডিজেল, বিভিন্ন জ্বালানি বহনকারী ১০টিরও বেশি জাহাজ সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করেছে, যা স্বল্পমেয়াদে কিছুটা আশাব্যঞ্জক চিত্র উপস্থাপন করেছে। সেইসঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে তাৎক্ষণিক জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
ডিসিসিআইয়ের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অনিশ্চয়তাপূর্ণ এবং সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী ও ভৌগোলিকভাবে আরও বিস্তৃত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি একাধিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। এর মধ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে সম্ভাব্য বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনীতিকে সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে ঢাকা চেম্বার সরকারের প্রতি প্রয়োজনীয় অগ্রিম ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে।
বিশেষ করে, কৌশলগত জ্বালানি মজুত আরও জোরদার করা, জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, সাপ্লাই চেইনের কার্যকারিতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় আরও সুদৃঢ় করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করছে ডিসিসিআই। কারণ দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক সংঘাত শুধু বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্যই নয়, বরং বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সহনশীলতার জন্যও ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

