সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের জমা রাখা অর্থ ২০২৫ সালে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ–সংশ্লিষ্ট আমানত প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩৪ দশমিক ২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ।
বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, এই অর্থের পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ হাজার ৭০০ কোটি টাকারও বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এটি সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশ–সংশ্লিষ্ট আমানতের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থান।
ব্যাংকগুলোর আমানত বৃদ্ধিতেই বড় উল্লম্ফন
এসএনবির তথ্য বলছে, মোট আমানত বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো। ২০২৪ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত ছিল প্রায় ৫৭৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। এক বছরের মধ্যে তা বেড়ে ৮২২ দশমিক ৭ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে পৌঁছেছে।
ফলে মোট বাংলাদেশি আমানতের প্রায় ৯৯ শতাংশই এখন ব্যাংকিং খাতের মাধ্যমে জমা রাখা অর্থ। আগের বছরগুলোর তুলনায় এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
ব্যক্তিগত আমানত কমেছে
অন্যদিকে ব্যক্তিগত গ্রাহকদের নামে সুইস ব্যাংকে রাখা অর্থের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। ২০২৪ সালে ব্যক্তিগত হিসাবগুলোতে যেখানে ১২ দশমিক ৬ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ জমা ছিল, ২০২৫ সালে তা কমে ১১ দশমিক ৪ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে নেমে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামগ্রিক আমানত বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যাংকিং লেনদেন থেকে, ব্যক্তিগত আমানত থেকে নয়।
দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ
সুইস ব্যাংকে জমা রাখা অর্থের পরিমাণের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। তালিকার শীর্ষে রয়েছে ভারত।
এসএনবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতীয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুইস ব্যাংকে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। তবে আগের বছরের তুলনায় ভারতের আমানত প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হলেও প্রবৃদ্ধির হার ছিল অনেক বেশি। একই সময়ে আফগানিস্তান থেকেও সুইস ব্যাংকে আমানত বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে।
অতীতের রেকর্ড কী বলছে?
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশ–সংশ্লিষ্ট আমানতের সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়ে ওঠে ২০২১ সালে। সে বছর আমানতের পরিমাণ ছিল ৮৭১ দশমিক ১ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ, যা এখনো সর্বকালের সর্বোচ্চ।
পরবর্তী কয়েক বছরে এ পরিমাণ ওঠানামা করলেও ২০২৫ সালে আবারও বড় ধরনের বৃদ্ধি দেখা গেছে। ফলে বর্তমান আমানতের পরিমাণ ২০২১ সালের রেকর্ডের খুব কাছাকাছি অবস্থানে পৌঁছেছে।
সুইস ব্যাংকের পরিসংখ্যানে কী অন্তর্ভুক্ত থাকে?
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে ব্যক্তিগত আমানত ছাড়াও ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য সংস্থার জমা রাখা অর্থ অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে প্রকাশিত মোট অঙ্ককে ব্যক্তিগত নাগরিকদের অর্থ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব তথ্য কোনো দেশের নাগরিকদের অবৈধ সম্পদের পরিমাণ নির্দেশ করে না। বরং এতে বৈধ ব্যাংকিং লেনদেন, প্রাতিষ্ঠানিক আমানত, বাণিজ্যিক তহবিল ও আন্তঃব্যাংক হিসাবও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
কেন আলোচনায় সুইস ব্যাংক?
দীর্ঘদিন ধরেই গ্রাহকের তথ্য গোপন রাখার নীতির কারণে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সেখানে অর্থ জমা রাখে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক আর্থিক স্বচ্ছতা এবং তথ্য বিনিময় সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির ফলে সুইস ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। এর প্রভাবেও অনেক গ্রাহক তাদের অর্থ বিভিন্ন দেশে স্থানান্তর করছেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

