প্রতি কেজি আপেল ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, বেদানা (আনার) ৩৮০ থেকে ৪৮০ টাকা, কমলা ৩০০ টাকা, নাশপাতি ও মাল্টা ২৮০ টাকা ও আঙুর ২৮০ থেকে ৩৮০ টাকা। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ফুটপাতের ফল বিক্রেতা মো. জিহাদ এভাবেই দামের কথা জানান। শুধু জিহাদই নন, রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায়, এমনকি মসজিদের সামনে ফুটপাতে বা ভ্যানে এই দরে বিদেশি ফল বিক্রি করছেন অসংখ্য বিক্রেতা।তারা বলছেন, দেশি ফলের মৌসুমেও বিদেশি ফল বিক্রিতে ভাটা পড়েনি। আগের চেয়ে দোকান বাড়ছে। এসব ফল কিনতে মধ্যবিত্তরাই আসছেন বেশি। ক্রেতারাও বলছেন, একই পণ্য ফুটপাতে কম দামে পাওয়া যায়। মার্কেটে কেজিতে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়। শুক্রবার বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমনই তথ্য জানা গেছে।আমের মৌসুম প্রায় শেষ পর্যায়ে। তাই দাম বেশি। আগে বিভিন্ন জাতের আম ১২৫ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে ৩০০ টাকা কেজি ছাড়িয়েছে। তবে ড্রাগন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, পেয়ারা ৭০ থেকে ১০০ টাকা কেজি এবং কলার ডজন ৯০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তারপরও রাজধানীতে বিদেশি ফলের ছড়াছড়ি। শুক্রবার (৫ সেপ্টেম্বর) কারওয়ান বাজারে দেখা যায় অসংখ্য ফল বিক্রেতা ফুটপাতে ভ্যানে করে বিদেশি বিভিন্ন ফল বিক্রি করছেন। জিহাদ, মালেকসহ অন্য ফল বিক্রেতারা খবরের কাগজকে জানান, বছর দুয়েক ধরে ফলের দর বেড়েছে। তারপরও ভালোই বিক্রি হয়। কিন্তু গত বছর সরকার পরিবর্তনের পর মানুষের টাকা কমে গেছে। তারপরও রাজধানীর বাদামতলী পাইকারি বাজার থেকে কেনার কারণে মার্কেটের তুলনায় একটু কম দামেই বিক্রি করছি। এ জন্য কাস্টমারও আসেন। এ সময় জিহাদের দোকানে প্রান্থপথ থেকে আসা সুব্রত নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘আনার দিন। ৪০০ টাকা কেজি রাখেন।’ জিহাদ বলেন, ‘এটা সাইজে বড়। দেওয়া যাবে না। ৪৮০ টাকা কেজি। তবে একটু ছোটগুলো নেন ৩৮০ টাকায় দেওয়া যাবে।’ অবশেষে সুব্রত ৪৬০ টাকা কেজি দরে কেনেন। অন্য ক্রেতাদেরও কিছু ফল কিনতে দেখা যায়। এ সময় জিহাদ বলেন, ‘ভালোই জিনিস রাখি। দোকানে একই আনার অনেক বেশি দামে বিক্রি করছে।’
তার কথার সত্যতা যাচাই করতে একই বাজারের কিচেন মার্কেটের মায়ের দোয়া ফল বিতানসহ অন্য দোকানে যাই। দোকানের বিক্রেতারা দামের ব্যাপারে খবরের কাগজকে জানান, আপেল ৩৬০ থেকে ৪৫০ টাকা, মাল্টা ও নাশপাতি ৩২০ টাকা, আনার ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, কমলা ৩৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শুধু এই বাজারেই নয়, মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারেও দেখা গেছে একই চিত্র। এই বাজারের আফজাল ফল ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী মো. আফজাল হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগের চেয়ে বিদেশি সব ফলের দাম বেড়েছে। আবার সরকার বদলের পর কাস্টমারও কমেছে। অনেকের আয়ও কমে গেছে। এ জন্য বিক্রি কমে গেছে। তারপরও আঙুর ৪০০ টাকা কেজি, বিচি ছাড়া আঙুর ৭০০ টাকা, আনার ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, নাশপাতি ৩২০ টাকা, কমলা ৩৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।’ দাম এত বেশি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাদামতলী থেকে ক্যারেটে আনা হয়। তাতে কিছু বাদ যায়। তারা সিন্ডিকেট করেই দাম বাড়ায়-কমায়। কিছু লাভ করে আমাদের সেভাবেই বিক্রি করতে হয়।’
অথচ ফুটপাতে বিভিন্ন ফল বিক্রেতা মার্কেটের চেয়ে কম দরে এসব ফল বিক্রি করছেন। মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের কাছে ফুটপাতের ফল বিক্রেতা আব্দুল মালেক বলেন, ‘আপেল ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি, বেদানা ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, আঙুর ৩৫০ থেকে ৪৫০ ও মাল্টা ২৮০ টাকায় বিক্রি করছি।’ শুধু ফুটপাতেই নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মসজিদের সামনে জুমার দিনে (শুক্রবার) ভ্যানে বিদেশি ফল বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, দোকান ভাড়া লাগে না। বাদামতলী থেকে সরাসরি এনে কিছু লাভে বিক্রি করা হয়। তবে মানুষের আয় কমে যাওয়ায় আগের চেয়ে বিক্রি কমে গেছে। বিক্রেতাদের কথার সত্যতা যাচাই করতে বিদেশি ফলের মোকাম বাদামতলীতে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাথী ফ্রুটসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘একদিকে সরকার বিদেশি ফলকে লাক্সারি পণ্য মনে করে বেশি করে শুল্ক আরোপ করেছে। এতে ফলের দাম ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে গত বছর সরকার পরিবর্তনের ফলে অনেকেই আত্মগোপনে চলে গেছেন। ফলে বেচাবিক্রি ৪০ শতাংশ কমে গেছে। কারণ ফলের বাজারও অর্থনীতির বাইরে নয়। তাই মন্দার প্রভাব এখানেও পড়েছে। এটা অস্বীকার করা যাবে না। এর ফলে আমদানিও কমে গেছে।’
দেশে আমদানি করা ফলের প্রধান বাজার বাদামতলী। অভ্যন্তরীণ এবং আমদানি করা ফলের প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যবসা এই পাইকারি বাজারকেন্দ্রিক। প্রতিদিন প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কোটি টাকার ফল বেচাকেনা হয় এখানে। তবে বাদামতলীতে গড়ে উঠেছে একটি সিন্ডিকেট চক্র। তারাই ফলের দাম ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করে। বাদামতলীতে প্রতিদিন প্রায় ১৮০ থেকে ২০০টি ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানভর্তি আমদানি করা ফল আসে। বিদেশি ফলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় আপেল, আঙুর, কমলা, মাল্টা, আনার ও নাশপাতি। বিশ্বের ৪৬টি দেশ থেকে এই ছয়টি ফল আমদানি হয়। এর মধ্যে চীন, ব্রাজিল, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ভুটান, মিসর ও দক্ষিণ আফ্রিকা অন্যতম। বিদেশি ফলের বাজারে বেশি আধিপত্য আপেল, মাল্টা ও আঙুরের। তবে রোজার মাসে সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে খেজুরের। তখন দামও বেড়ে যায়। দামের ব্যাপারে বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘চাহিদার ওপর দাম নির্ভর করে। কোনো সিন্ডিকেট কাজ করে না। প্রতি কেজি আপেল, নাশপাতি মাল্টাতে শুল্ক দিতে হয় ১১০ টাকা করে, আনারে ১৪৮ টাকা ও আঙুরে ১৬০ টাকা। সরকার যদি শুল্ক কমায় তাহলে ভোক্তারা আরও কম দরে বিদেশি ফল খেতে পারবেন।’

