ঘুরে দাঁড়ানো মানেই সবকিছু নতুন করে শুরু করা নয়। সব সময় বড় পুঁজি লাগে না, বড় ঘোষণা লাগে না, কিংবা একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ অসাধারণ আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠাও লাগে না।
কখনো কখনো ঘুরে দাঁড়ানো মানে হলো, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কাজের খাতাটা আবার খুলে বসা। মেহেরও তাই করল।
সে প্রথমে নিজের কাজগুলোকে নতুন করে গুছিয়ে নিতে শুরু করল। কোন পণ্য তার হাতে আছে, কোন কাজটি সে ভালো পারে, কোন সেবাটি মানুষের প্রয়োজন হতে পারে—একটি একটি করে হিসাব করল। বুঝল, শুধু ছবি পোস্ট করলেই মানুষ পণ্য কিনবে না। মানুষের প্রয়োজন বুঝতে হবে, পণ্যের গুণাগুণ স্পষ্ট করে বলতে হবে, ক্রেতার প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, বিশ্বাস তৈরি করতে হবে।
সে আরও বুঝল, নিজের কাজের প্রচার করা আর নিজের বড়াই করা এক নয়।
একজন কারিগর যখন নিজের তৈরি পণ্যের কথা বলেন, তখন তিনি শুধু বিক্রির চেষ্টা করেন না; তিনি তাঁর শ্রমের মূল্যও তুলে ধরেন। একজন নারী যখন নিজের কাজের পরিচয় দেন, তখন তিনি কাউকে ছোট করেন না; বরং নিজের অস্তিত্বকে স্বীকার করেন।
এই উপলব্ধি তাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল।
সে আবার লিখতে শুরু করল। কখনো নিজের কাজ নিয়ে, কখনো অন্য উদ্যোক্তাদের নিয়ে, কখনো সাধারণ মানুষের জীবনে লুকিয়ে থাকা অসাধারণ গল্প নিয়ে। সে চাইত, তার লেখা পড়ে কেউ যেন নিজের জীবনের কোনো অজানা শক্তিকে চিনতে পারে।
একটি লেখা প্রকাশিত হলে সে খুশি হতো। পাঠক কম হলেও লিখত। কোনো পোস্টে বিক্রি না হলেও কাজের কথা বলত। তবে এবার সে নিজের কাছে একটি প্রতিশ্রুতি রেখেছিল—অন্যের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়, নিজের কাজকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সে চেষ্টা করবে।
সে আর প্রতিটি নীরবতাকে প্রত্যাখ্যান ভাবত না। প্রতিটি ব্যর্থতাকে নিজের অযোগ্যতার প্রমাণ মনে করত না।
তার মনে হলো, পৃথিবী তাকে স্বীকৃতি দেবে কি না, সেটা তার নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু সে নিজের কাজের মান বাড়াবে কি না, শিখতে থাকবে কি না, ভুল থেকে শিক্ষা নেবে কি না—সেটা তার হাতে আছে।
এই সামান্য উপলব্ধিটুকুই তার কাছে নতুন করে বাঁচার দরজা খুলে দিল।
আত্মবিশ্বাসের প্রকৃত অর্থ
একদিন মেহেরের এক পরিচিত নারী তাকে বলেছিলেন, ‘তোমাকে এখন আগের মতো আত্মবিশ্বাসী মনে হয় না।’
কথাটা শুনে মেহের হাসল।
সে জানত, মানুষ আত্মবিশ্বাস বলতে অনেক সময় উচ্চকণ্ঠে কথা বলা, নিজের সাফল্যের গল্প বলা কিংবা সব পরিস্থিতিতে নির্ভীক থাকার অভিনয়কে বোঝে।
কিন্তু তার কাছে আত্মবিশ্বাসের অর্থ এখন অন্য রকম।
আত্মবিশ্বাস মানে সব উত্তর জানা নয়; না জানলে শিখতে প্রস্তুত থাকা।
আত্মবিশ্বাস মানে কখনো ভেঙে না পড়া নয়; ভেঙে পড়ার পর নিজের ভাঙা অংশগুলোকে অবহেলা না করা।
আত্মবিশ্বাস মানে সবাই তোমাকে পছন্দ করবে—এমন আশা করা নয়; কেউ অপছন্দ করলেও নিজের মূল্যবোধ বিসর্জন না দেওয়া।
আর আত্মবিশ্বাস মানে এই নয় যে তুমি কখনো সাহায্য চাইবে না। বরং কখন নিজের সামর্থ্য যথেষ্ট নয়, কখন পরামর্শ দরকার, কখন অন্যের সহযোগিতা গ্রহণ করা উচিত—সেটা বুঝতে পারাও আত্মবিশ্বাসের অংশ।
মেহের বলেছিল, ‘আমি এখনো ভয় পাই। এখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা হয়। এখনো কোনো কোনো রাতে মনে হয়, এত চেষ্টা করে কী পেলাম? কিন্তু এখন আর নিজের ভয়কে আমার অক্ষমতার প্রমাণ মনে করি না।’
নারীটি চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
মেহের আবার বলেছিল, ‘আগে ভাবতাম, সফল হতে পারলেই নিজের যোগ্যতা প্রমাণ হবে। এখন বুঝি, চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিজের ভুল স্বীকার করা, প্রয়োজন হলে পথ বদলানো এবং নিজের প্রতি সম্মান বজায় রাখাটাও যোগ্যতার অংশ।’
সেদিন কথাগুলো বলতে গিয়ে মেহের বুঝেছিল, তার ভেতরে কিছু একটা সত্যিই বদলেছে।
তার জীবন রাতারাতি বদলে যায়নি। ব্যবসার সব সমস্যা মিটে যায়নি। অভাবের হিসাবও শেষ হয়নি। কিন্তু সে নিজের দিকে তাকানোর দৃষ্টিটা বদলাতে পেরেছে।
কখনো কখনো মানুষের জীবনে এটাই প্রথম বিজয়।
যে আলো নিজের ভেতরে জ্বলে
এক সন্ধ্যায় মেহের কাজের টেবিলে বসেছিল। সামনে কিছু কাপড়, সুতা, অসমাপ্ত নকশা আর একটি খাতা। জানালার বাইরে আলো কমে আসছিল। ঘরের ভেতরে সংসারের পরিচিত শব্দ।
হঠাৎ তার মনে পড়ল সেই দিনগুলোর কথা, যখন সে প্রথম নিজের উদ্যোগ শুরু করেছিল। তখনও তার কাছে সব উত্তর ছিল না। তখনও সে জানত না, কত বাধা আসবে, কত মানুষ পাশে থাকবে, কতজন দূরে সরে যাবে।
তবু সে শুরু করেছিল।
আজও তার সব উত্তর জানা নেই। ভবিষ্যতে সে কতটা সফল হবে, কতজন তার লেখা পড়বে, কতজন তার তৈরি পণ্য কিনবে, কিংবা তার কাজ আবার কতগুলো পরিবারের নির্ভরতার জায়গা হয়ে উঠবে—কিছুই নিশ্চিত নয়।
কিন্তু একটা বিষয় সে নিশ্চিতভাবে জানে—তার জীবন এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
একটি খারাপ সময় তার সমস্ত অতীতকে মিথ্যা করে দিতে পারে না। কয়েকটি ব্যর্থতা তার সমস্ত দক্ষতাকে মুছে দিতে পারে না। কিছু মানুষের অবহেলা তার সমস্ত ভালোবাসার মূল্য কমিয়ে দিতে পারে না।
আর দেরিতে এগিয়ে যাওয়া মানেই পিছিয়ে পড়া নয়।
মানুষের জীবন কোনো প্রতিযোগিতার মাঠ নয়, যেখানে সবাইকে একই সময়ে একই জায়গায় পৌঁছাতে হবে। কারও পথ মসৃণ, কারও পথ কাঁটায় ভরা। কেউ সুযোগ পায় খুব অল্প বয়সে, কেউ নিজের শক্তিটুকু চিনতেই জীবনের অনেকটা সময় পার করে ফেলে।
তাই বলে তার গল্প শেষ হয়ে যায় না।


