বর্তমান সময়ে প্রতারণার ধরন ও কৌশল পাল্টে গেছে। প্রতারকরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থসম্পদ হাতিয়ে নিচ্ছে। বেশি অপরাধ হচ্ছে অনলাইন তথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে। ফেসবুকে চটকদার বিজ্ঞাপন এবং বিভিন্ন প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে মানুষকে বোকা বানাচ্ছে প্রতারক চক্র। প্রতিদিন বিভিন্ন ক্ষেত্রে অহরহ ঘটছে প্রতারণার ঘটনা। সরল বিশ্বাসের সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে অপরাধী চক্র। মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম), জিনের বাদশা, ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী পর্যায়ে নানা ধরনের প্রলোভন দিয়ে ফাঁদে ফেলাসহ অনলাইনে নানা পণ্যের কেনাবেচার নামে প্রতারণা এখন অহরহ। দেশে এমন কোনো খাত বা ক্ষেত্র নেই, যেখানে প্রতারণা হচ্ছে না বা প্রতারক নেই। কখনো বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা, কখনো গোয়েন্দা সংস্থার পদধারী ব্যক্তি, আবার কখনো সরকারের প্রভাবশালী কর্তাব্যক্তির পরিচয়ে তৎপরতা চালাচ্ছে পেশাদার অপরাধী প্রতারক চক্র। অভিনব কূটকৌশল আর চটকদার কথার জাদু দিয়ে সহজ-সরল মানুষকে ভুলিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে তারা। অনেকে প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে প্রতারকদের খপ্পরে পড়ছেন। এতে ব্যক্তি বা পরিবার সর্বস্বান্ত হচ্ছে। দিশেহারা এসব ভুক্তভোগী মামলা দিলেও যথাযথ প্রতিকার বা ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী গ্রেপ্তার হলেও প্রতারণার মামলার দুর্বল ধারার সুযোগে খুব সহজেই জামিনে মুক্তি পাচ্ছে। পাশাপাশি প্রতারণায় বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় শাস্তিও খুব স্বল্প। এসব কারণে প্রতারকদের বিরুদ্ধে সময়োপযোগী আইন প্রয়োগ ও শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শাস্তি কত কঠিন দেওয়া গেল, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কতজন অপরাধীর অপরাধ প্রমাণ করা গেল বা তাকে শাস্তি দেওয়া গেল কি না। অপরাধের বিচার করে শাস্তি কার্যকর হওয়ার উদাহরণ থাকলে অপরাধ কমবে। দণ্ড বাড়িয়ে দিলে বরং আইন কার্যকর বা বিচারের উদাহরণ কমে যেতে পারে। দণ্ড যত বেশি হবে, বিচারক তত বেশি সাবধানি হবেন। কারণ ভুল বিচারে যেন একজন মানুষও গুরুদণ্ড না পান, সেটা বিচারকরা খুব বেশি মাথায় রাখেন। প্রতারণার বিরুদ্ধে ৪০৬ ও ৪২০ ধারার শাস্তি বাড়ালে তা আবার অন্য ধারার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। সব মিলিয়ে দণ্ড বাড়ানোর চেয়ে আইনের প্রয়োগের ওপর বেশি জোর দেওয়া উচিত।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, প্রতারণার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের কমবেশি দায় রয়েছে। সমাজে একশ্রেণির মানুষ রয়েছেন, যারা সরল বিশ্বাসী। আবার অনেকে লোভী প্রকৃতির। এই সহজ-সরল লোভী প্রকৃতির মানুষকেই টার্গেট করছে প্রতারক চক্র। পাশাপাশি দুর্বল আইনি ব্যবস্থা আইনের প্রয়োগে শিথিলতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়- এই কারণগুলো সম্মিলিতভাবে প্রতারণা বৃদ্ধির জন্য দায়ী। আগের সময়ের তুলনায় বর্তমান সময়ে প্রতারণামূলক অপরাধের ধরন ও ভয়াবহতা দুটিই মারাত্মক আকারে বেড়েছে। কিন্তু সে অনুসারে আইন ও সাজা যুগোপযোগী করা হয়নি। আইনের কঠোর প্রয়োগ ও শাস্তি দৃশ্যমান করতে হবে। বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, কোনো সমাজে অপরাধ প্রবণতা তখনই বাড়ে, যখন আইনের যথাযথ প্রয়োগ বা দৃশ্যমান শাস্তি না থাকে। বহুরূপী প্রতারণা থামাতে সরকারকে সময়োপযোগী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রতারণার ধরন ও কৌশল অনুযায়ী যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ ব্যাপারে সাধারণ নাগরিকদেরও যথেষ্ট সচেতন থাকা জরুরি। ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে প্রতারণার ফাঁদে পা বাড়ানো যাবে না। যেকোনো বিষয়ে অস্বাভাবিক কিছু মনে হলে অবশ্যই তা খতিয়ে দেখতে হবে। অর্থাৎ বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে তার যথার্থতা আছে কি না। সর্বোপরি আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে। আশা করছি, সরকার প্রতারণা থামাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

