কাল সোমবার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রত্যাশা, অর্থনীতির গতিবিধি ও জন-আকাক্সক্ষার প্রতিফল দেখার প্রত্যাশা থাকে বাজেটে। এবার বাজেটে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত (এলডিসি) থেকে উত্তরণের শর্ত হিসেবে সম্পূরক শুল্ক কমানো হচ্ছে। ফলে দেশীয় শিল্পে আসতে পারে ধাক্কা!
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হবে। কাল টেলিভিশনের পর্দায় বাজেট পেশ করবেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। এ বাজেট ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ কম। চলতি অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার।
বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত। যে কারণে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষার জন্য যেকোনো পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করতে পারে বাংলাদেশ। এর জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ করে বিশ^বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) কাছে কোনো ধরনের জবাবদিহি করতে হয় না। কিন্তু আগামী বছরের ২৪ নভেম্বর এলডিসি তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটবে। ফলে তখন চাইলেই আর বাংলাদেশ যখন-তখন যেকোনো পণ্যে সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কের মতো শুল্ক আরোপ করতে পারবে না। ফলে একদিকে যেমন রাজস্ব কমবে, অন্যদিকে দেশীয় শিল্পের সংরক্ষণ হ্রাস পাবে।
এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকেই বিভিন্ন পণ্যের সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার এবং হ্রাস করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের রূপান্তর প্রক্রিয়া যাতে মসৃণ হয়, সেজন্য একটি স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস) বা মসৃণ রূপান্তর কৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে। ওই রূপান্তর কৌশলে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা অনুসারে পণ্য আমদানি ও রপ্তানির শুল্ক যৌক্তিকীকরণের জন্য একটি আধুনিক জাতীয় শুল্কনীতি বা ন্যাশনাল ট্যারিফ পলিসি প্রণয়নের কথা রয়েছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ একটি ট্যারিফ পলিসি প্রণয়ন করে। ওই ট্যারিফ পলিসি অনুসারে আগামী অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু পণ্যের শুল্ক যৌক্তিকীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৭২টি পণ্যের সম্পূরক শুল্ক কমানোর প্রস্তাব থাকতে পারে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে। এ ছাড়া শতাধিক পণ্যের সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা হতে পারে।
বর্তমানে মোট যে রাজস্ব আহরণ হয়, তার ৩০ শতাংশের মতো আসে আমদানিপর্যায়ের বিভিন্ন শুল্ক-কর থেকে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর যত্রতত্র শুল্ক আরোপের সুযোগ রহিত হওয়ায় আমদানিপর্যায় থেকে রাজস্ব আহরণ হ্রাস পাবে। ফলে সেই হ্রাস পাওয়া রাজস্ব পুষিয়ে নিতে বিকল্প উৎস থেকে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। এজন্য অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন নতুন রাজস্ব উদ্ভাবন করা লাগবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসটিএস প্রণয়ন কাজের পরামর্শক ড. এম এ রাজ্জাক সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে একটা চাপের মধ্যে পড়বে, এটা ঠিক। বিশেষ করে বিভিন্ন কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা কঠিন কাজ হবে। কিন্তু আমরা যদি ভবিষ্যতের বৃহত্তর উন্নয়নের কথা চিন্তা করি, তাহলে দেখা যায়, এসব উদ্যোগ কোনো না কোনো সময় আমাদের বাস্তবায়ন করতেই হবে। ফলে এলডিসি থেকে উত্তরণ উপলক্ষে যদি আমরা ভবিষ্যতের প্রস্তুতিটা নিয়ে ফেলতে পারি, তাহলে সেটি খুবই ফলদায়ক হবে। সেই বিবেচনায় এলডিসি থেকে উত্তরণ একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য একটি বড় সুযোগও বটে।
চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানিপর্যায় থেকে রাজস্ব আহরণের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯৩ হাজার ৯৩ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৮২ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে এ খাত থেকে বড় অঙ্কের রাজস্ব হ্রাস পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’
এদিকে শুল্ক যৌক্তিকীকরণের অংশ হিসেবে আগামী অর্থবছর থেকে বিভিন্ন শুল্কস্তর পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে। বর্তমানে আমদানি শুল্কের ছয়টি স্তর রয়েছে। এগুলো হলো ০, ১, ৫, ১০, ১৫ ও ২৫ শতাংশ। আগামী অর্থবছর থেকে একটি স্তর বাড়িয়ে সাতটি করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে আমদানি শুল্কের স্তরগুলো হবে ০, ১, ৩, ৫, ১০, ১৫ ও ২৫ শতাংশ। সম্পূরক শুল্কের ক্ষেত্রে বর্তমানে ১২টি স্তর রয়েছে। আগামী অর্থবছর থেকে তা ১৩টি স্তরে উন্নীত করা হচ্ছে। বর্তমান সম্পূরক শুল্কস্তরগুলো হচ্ছে ১০, ২০, ৩০, ৪৫, ৬০, ১০০, ১৫০, ২০০, ২৫০, ৩০০, ৩৫০ ও ৫০০ শতাংশ। আগামী অর্থবছর থেকে যে ১৩টি স্তর হবে, সেগুলো হচ্ছে ১০, ২০, ৩০, ৪০, ৪৫, ৬০, ১০০, ১৫০, ২০০, ২৫০, ৩০০, ৩৫০ ও ৫০০ শতাংশ। এ ছাড়া যেসব পণ্য আমদানিতে সর্বোচ্চ পরিমাণ, তথা ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক রয়েছে, সেগুলোর ওপর থেকে সব ধরনের নিয়ন্ত্রলনমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে।
বিদেশ থেকে উন্নতমানের মাখন আমদানিতে বর্তমানে ৮৯ দশমিক ৩২ শতাংশ শুল্ক-কর পরিশোধ করতে হয়। আগামী অর্থবছর থেকে এ পণ্যটির ওপর বর্তমানে বিদ্যমান থাকায় ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। সয়াবিন তেলের আমদানি শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি সয়াবিন বীজ ও সয়ামিল আমদানিতে শুল্ক কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ফলে জুস আমদানিতে সার্বিকভাবে করভার রয়েছে ২৮৯ শতাংশ। আগামী অর্থবছর থেকে এটি কমিয়ে ২১২ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
শুল্ক যৌক্তিকীকরণের অংশ হিসেবে যেসব বিভিন্ন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক কমানো হবে, তেমনটি নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক বাড়ানোও হবে। তেমন একটি পণ্য তামাকের বীজ। তামাক জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি পণ্য। তাই এটির চাষাবাদ নিরুৎসাহিত করতে চায় সরকার। বর্তমানে তামাকের বীজ আমদানিতে কোনো ধরনের শুল্ক দিতে হয় না। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিবেচনায় আগামী অর্থবছর থেকে তামাকের বীজ আমদানিতে ২৫ শতাংশ বসানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশের জন্য চরম ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচিত একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য। পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিতে সরকার সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে চায়। সেজন্য এই সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের তৈজসপত্রের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক বাড়তে পারে।
সিমেন্টশিল্পে কাঁচামাল ক্লিংকার আমদানির শুল্ক-কর পুনর্নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া চমড়াশিল্প একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। এ শিল্পের জন্য ওয়্যারহাউজ সুবিধা আছে। কিন্তু এ শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কেমিক্যাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক রয়েছে। এ শিল্পের সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আগামী অর্থবছর থেকে এ শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন রাসায়নিক আমদানির শুল্ক কমানো হতে পারে।

