পত্রিকার পাতা
ঢাকাবুধবার , ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. উদ্যোক্তা
  5. কর্পোরেট
  6. কৃষি ও প্রকৃতি
  7. ক্যাম্পাস-ক্যারিয়ার
  8. খেলাধুলা
  9. চাকরির খবর
  10. জাতীয়
  11. তথ্যপ্রযুক্তি
  12. তারুণ্য
  13. ধর্ম
  14. পর্যটন
  15. প্রবাস
আজকের সর্বশেষ সব খবর

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নীরব সাক্ষী ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি

Md Abu Bakar Siddique
অক্টোবর ১৮, ২০২৫ ১:০৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা পেরিয়ে সময়ের পরতে পরতে গড়ে উঠেছে এক নীরব ইতিহাসের স্থান কুমিল্লার ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি। শান্ত পাহাড়ি সবুজে মোড়া এ সমাধিক্ষেত্রটি শুধু যুদ্ধের ইতিহাস নয়, মানবতার করুণ স্মৃতিও বহন করে। এখানে শুয়ে আছেন বিভিন্ন দেশের বীররা- যাদের আত্মত্যাগ আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। ওয়ার সিমেট্রি ঘুরে বিস্তারিত জানাচ্ছেন সায়মা ইয়েন

ইতিহাস ও পটভূমি
ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি, যা স্থানীয়ভাবে ‘ইংরেজ কবরস্থান’ নামে পরিচিত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৪ সালের মধ্যে নির্মিত হয়। এটি মূলত কমনওয়েলথ সমাধিক্ষেত্র, যেখানে ব্রিটিশ কমনওয়েলথের বিভিন্ন দেশের সেনাদের কবর রয়েছে। সাড়ে চার একর পাহাড়ি ভূমিতে গড়ে ওঠা এ কবরস্থানটি বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম কমনওয়েলথ সমাধিক্ষেত্র। এর প্রথমটি চট্টগ্রামে অবস্থিত, যেখানে ৭৫৫ জন সেনার কবর আছে। কুমিল্লার এই সমাধিক্ষেত্রে মোট ৭৩৬ (কেউ কেউ বলেন ৭৩৭ জন) সেনার কবর রয়েছে। তারা সবাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রাণ হারিয়েছিলেন।

অবস্থান ও পরিবেশ
এ কবরস্থানটি কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে, ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের পাশে অবস্থিত। শান্ত পাহাড়ি প্রান্তরে অবস্থিত এ জায়গাটি এতটাই পরিচ্ছন্ন ও সবুজে ভরা যে, এখানে প্রবেশ করলেই এক ধরনের নীরব প্রশান্তি অনুভূত হয়। প্রবেশমুখে রয়েছে একটি সুন্দর তোরণদ্বার, যেখানে ইংরেজি ও বাংলায় এই সমাধিক্ষেত্রের ইতিহাস ও বিবরণ খোদাই করে লেখা আছে। ভেতরে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে ব্রিটিশ যুদ্ধ সমাধিক্ষেত্রের প্রতীকী ক্রস (Cross of Sacrifice), যা সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে নির্মিত।
প্রতিটি কবরের ওপর রয়েছে সাদা পাথরের ফলক। সেখানে খোদাই করা আছে সেনার নাম, পদবি, মৃত্যুর তারিখ এবং ধর্মীয় প্রতীক। মুসলিম সেনাদের কবরের ওপর আরবি লেখা, খ্রিষ্টানদের ক্রস চিহ্ন দেখা যায়। দুটি কবর পরপরই রোপণ করা হয়েছে রঙিন ফুলের গাছ, যা প্রাঙ্গণটিকে করে তুলেছে প্রাণবন্ত ও শ্রদ্ধাপূর্ণ।

বিশেষ তথ্য
প্রতি বছর নভেম্বরে এখানে এক ধর্মীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ইসলাম, খ্রিষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধসহ সব ধর্মীয় নেতারা একত্র হয়ে নিহত সেনাদের আত্মার শান্তি কামনা করেন। এই অনুষ্ঠান আন্তর্জাতিক সংহতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই সমাধিক্ষেত্রের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো- এখানে ২৩ জন বিমানবাহিনীর সেনার আলাদা সমাধি রয়েছে। এ ছাড়া যে একটি কবর নিয়ে স্থানীয় মাধ্যমের সঙ্গে মতবিরোধ রয়েছে, ধারণা করা হয় সেটি একটি প্রতীকী কবর।

প্রবেশ সময় ও নিয়মাবলি
ওয়ার সিমেট্রি প্রায় সারা বছরই খোলা থাকে, শুধু ঈদের দুদিন ছাড়া। সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা এবং দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভ্রমণ সময়। প্রবেশ ফ্রি, তবে ভেতরে শান্ত পরিবেশ বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।

কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল বা কমলাপুর থেকে বাসে উঠলে কুমিল্লা নামিয়ে দেবে। সময় লাগে প্রায় ২-৩ ঘণ্টা। ভাড়া বাসভেদে ২০০-৪৫০ টাকা।
ঢাকা থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত মহানগর প্রভাতী, তিতাস এক্সপ্রেসসহ একাধিক ট্রেন চলে। চট্টগ্রামগামী সুবর্ণা ও সোনার বাংলা ছাড়া প্রায় সব ট্রেনই কুমিল্লায় যাত্রাবিরতি দেয়। ট্রেন থেকে নেমে রিকশা অথবা সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে সহজেই যাওয়া যাবে।
কুমিল্লা শহরে পৌঁছে টমছম ব্রিজ কিংবা কান্দিরপার থেকে রিকশা বা অটোরিকশায় ১৫-৩০ মিনিটেই পৌঁছে যাবেন ওয়ার সিমেট্রির মূল ফটকে।

সিমেট্রির তাৎপর্য
ওয়ার সিমেট্রি শুধু মৃত সেনাদের কবর নয়- এটি যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা ও মানবতার মূল্য শেখায়। এখানে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, যুদ্ধ কারও জয় নয়, বরং মানবতার পরাজয়। এটি তরুণ প্রজন্মের কাছে ইতিহাস জানার এক জীবন্ত পাঠশালা। যুদ্ধের ভয়াবহতা ও শান্তির প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে এই স্থানটি এক নিঃশব্দ শিক্ষক।

ভ্রমণ সতর্কতা 
এটি একটি ধর্মীয় স্থান, তাই এখানে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা বা হাসাহাসি করা যাবে না। সমাধিফলক বা ক্রস স্পর্শ করা নিষিদ্ধ। খাবার খাওয়া বা ধূমপান করা যাবে না। আবর্জনা ফেললে জরিমানা হতে পারে। ছবি তোলা অনুমোদিত, তবে সম্মান বজায় রেখে। শিশুদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
এই নিয়মগুলো শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, এগুলো শহিদ সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশের অংশ।

কুমিল্লায় আরও দেখার স্থানগুলো
কুমিল্লা শুধু একটি ঐতিহাসিক শহর নয়, এটি একসঙ্গে ইতিহাস, ধর্ম, প্রকৃতি ও শিক্ষার মিলনস্থল। ওয়ার সিমেট্রি ঘুরে দেখার পর পর্যটকরা অল্প সময়ের মধ্যেই আরও বেশ কয়েকটি মনোমুগ্ধকর জায়গা ঘুরে দেখতে পারেন। জায়গাগুলো তুলনামূলক কাছাকাছি হওয়ায় সময় থাকলে সবগুলোতেই ঘোরা সম্ভব। নিচে উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো দেওয়া হলো-

ময়নামতি প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা ও জাদুঘর
বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের কাছেই অবস্থিত। এখানে পাওয়া গেছে প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার অমূল্য নিদর্শন।

ময়নামতি বৌদ্ধ মন্দির
ওয়ার সিমেট্রির কাছেই অবস্থিত এই আধুনিক বৌদ্ধ মন্দিরটি এখন স্থানীয় ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণ। এটি তুলনামূলক নতুন হলেও, এর স্থাপত্যে প্রাচীন বৌদ্ধ ধাঁচের ছোঁয়া রয়েছে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
ময়নামতি এলাকার আরেকটি দর্শনীয় স্থান হলো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। সবুজ পাহাড় ও মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘেরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস পর্যটকদের কাছেও জনপ্রিয়।

ধর্মসাগর দিঘি
কুমিল্লা শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক জলাধারটি স্থানীয় ও বাইরের পর্যটকদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য। সন্ধ্যার সময় দিঘির পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে পানিতে সূর্যাস্তের প্রতিফলন দেখা যায়, যা সত্যিই অপূর্ব দৃশ্য।

শালবন বিহার
বৌদ্ধ স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন শালবন বিহার এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক আকর্ষণ। এটি মূলত অষ্টম শতকের একটি বৃহৎ বৌদ্ধবিহার, যেখানে একসময় শতাধিক ভিক্ষু বসবাস করতেন।

লালমাই পাহাড় ও বায়রা লেক
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য লালমাই পাহাড় ও বায়রা লেক এক অনন্য স্থান। পাহাড়ি সবুজ, স্বচ্ছ লেক, পাখির কিচিরমিচির, সব মিলিয়ে এটি এক টুকরো প্রাকৃতিক স্বর্গ।

বার্ড (BARD)
বাংলাদেশ গ্রামীণ উন্নয়ন একাডেমি বা বার্ড শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়- এর পরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাস, বৃক্ষশোভিত পরিবেশ এবং স্থাপত্যও দর্শকদের আকৃষ্ট করে।

সবশেষ
ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি শুধু একটি কবরস্থান নয়, এটি ইতিহাস, শ্রদ্ধা ও শান্তির প্রতীক। সময় পেলে একবার ঘুরে আসুন এই নীরব শহরে, যেখানে মৃতরা কথা বলে না, কিন্তু তাদের নীরবতা বলার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। ইতিহাসপ্রেমী, প্রকৃতিপ্রেমী কিংবা ভ্রমণপিপাসু সবাই এখান থেকে ফিরবেন এক গভীর অনুভব নিয়ে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।