পত্রিকার পাতা
ঢাকারবিবার , ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. উদ্যোক্তা
  5. কর্পোরেট
  6. কৃষি ও প্রকৃতি
  7. ক্যাম্পাস-ক্যারিয়ার
  8. খেলাধুলা
  9. চাকরির খবর
  10. জাতীয়
  11. তথ্যপ্রযুক্তি
  12. তারুণ্য
  13. ধর্ম
  14. পর্যটন
  15. প্রবাস
আজকের সর্বশেষ সব খবর

পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার ইতিহাসের নীরব সাক্ষী

Md Abu Bakar Siddique
আগস্ট ২, ২০২৫ ৪:১৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় অবস্থিত পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, যা সোমপুর মহাবিহার নামেও পরিচিত। ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের জন্য এক অনন্য গন্তব্য। খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকে নির্মিত এই মহাবিহার শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই নয়, এটি উপমহাদেশের প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্র ও স্থাপত্যশৈলীর এক অমূল্য নিদর্শন। ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী এই স্থান ভ্রমণ যেকোনো জ্ঞানপিপাসু মনকে অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, এক অতল জ্ঞান ও নীরব সৌন্দর্যের জগতে।

ইতিহাসের পাতায় পাহাড়পুর
পাহাড়পুর মহাবিহার নির্মাণ করেছিলেন পাল বংশের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল (৭৭০-৮১০ খ্রি.)। সেই সময় এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র, যেখানে দেশ-বিদেশের বহু শিক্ষক-শিক্ষার্থী জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। তিব্বতীয় গ্রন্থ ‘তারানাথ’ অনুযায়ী, এখানে ৮ হাজার ভিক্ষু একসঙ্গে বাস করতেন। চীন ও নেপাল থেকে পণ্ডিতরা এখানে আসতেন তত্ত্ব, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে।
স্থাপত্যশৈলীর বিস্ময় মহাবিহারের প্রধান আকর্ষণের বিশাল চতুষ্কোণ আকৃতির মূল মন্দিরটি। ৯২২ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৯১৬ ফুট প্রস্থের একটি বর্গাকৃতির খোলা চত্বরের মাঝে এই মন্দির অবস্থিত। চারপাশে রয়েছে ১৭৭টি ভিক্ষু কক্ষ, যেগুলো একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। পুরো কাঠামোটি একপ্রকার বিশ্ববিদ্যালয় পল্লির মতো, যার কেন্দ্রস্থলে রয়েছে মূল উপাসনাগৃহ।
মন্দিরের প্রতিটি দেয়ালে খোদাই করা রয়েছে টেরাকোটা শিল্পকর্ম, যেখানে বিভিন্ন ধর্মীয় কাহিনি, জীবনচিত্র, প্রাণী ও পুষ্পলতা নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই নিদর্শনগুলো প্রমাণ করে যে, সে সময়ের শিল্পীরা কতটা দক্ষ ও সৃজনশীল ছিলেন।

আজকের পাহাড়পুর
বর্তমানে পাহাড়পুর একটি সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা। এখানে একটি জাদুঘরও রয়েছে, যেখানে পাওয়া বিভিন্ন প্রত্নবস্তু যেমন প্রাচীন মূর্তি, পাথরের ফলক, কষ্টিপাথরের শিল্পকর্ম, ধাতব মুদ্রা ও অন্যান্য উপকরণ সংরক্ষিত আছে। এই জাদুঘর ইতিহাস অনুরাগীদের জন্য একটি বড় আকর্ষণ।
পর্যটকদের জন্য রয়েছে সুশৃঙ্খলভাবে গড়ে তোলা ওয়াকওয়ে, বসার স্থান, ছায়াদানকারী গাছপালা এবং তথ্যপূর্ণ সাইনবোর্ড। প্রবেশের সময় একজন গাইড ভাড়া করলে পুরো এলাকা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

ভ্রমণের অভিজ্ঞতা
পাহাড়পুরে প্রবেশ করতেই এক ধরনের প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ে মনে। খোলা প্রান্তর, সবুজ ঘাসে ঘেরা ধ্বংসস্তূপ, পাখির ডাক ও প্রাচীন ইতিহাসের নিঃশব্দ সাক্ষ্য যেন মিলেমিশে এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করে। মাটির গায়ে গায়ে লেগে থাকা টেরাকোটার গল্পগুলো শুনতে যেন কান পেতে থাকতে হয়। দিনের বেলায় সূর্যের আলোয় যখন টেরাকোটা চিত্রগুলো ঝলমল করে ওঠে, তখন এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ জাগে মনে।
সন্ধ্যার আলো কমে এলে এখানে এক ধরনের অতীতময় আবছা আবহ তৈরি হয়—যেন প্রাচীন ভিক্ষুরা এখনো ধ্যানরত কিংবা দূর থেকে ভেসে আসছে প্রাচীন মন্ত্রোচ্চারণের ধ্বনি।

যেভাবে যাবেন
পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যাওয়া যায়, তবে সবচেয়ে সুবিধাজনক রুট হচ্ছে নওগাঁ ও জয়পুরহাট জেলার মাধ্যমে। রাজধানী ঢাকা থেকে সরাসরি সড়ক বা রেলপথে যাওয়া সম্ভব। সড়কপথে ভ্রমণ করতে চাইলে গাবতলী বা কল্যাণপুর থেকে নওগাঁগামী বিভিন্ন বাস যেমন- হানিফ, শ্যামলী, নাবিল বা রাজীব পরিবহনে করে নওগাঁ শহরে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে স্থানীয় সিএনজি, অটো বা মাইক্রোবাসে করে পাহাড়পুর যাওয়া যায়। যাত্রাপথ প্রায় ৩২ কিলোমিটার এবং সময় লাগে এক থেকে দেড় ঘণ্টা।
রেলপথে যেতে চাইলে ঢাকার কমলাপুর বা বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে জয়পুরহাটগামী আন্তনগর ট্রেনে যাওয়া যায়। লালমনি এক্সপ্রেস অথবা একতা এক্সপ্রেসে ভ্রমণ করলে সকাল বা সন্ধ্যায় জয়পুরহাট পৌঁছানো যায়। জয়পুরহাট থেকে পাহাড়পুরের দূরত্ব খুব কম, মাত্র ১২ কিলোমিটার। জয়পুরহাট রেলস্টেশন থেকে রিকশা, অটো বা সিএনজিতে সহজেই মহাবিহারে পৌঁছানো যায়।
এ ছাড়া চাইলে পাহাড়পুর রেলস্টেশনেও নেমে সরাসরি মহাবিহারে যাওয়া সম্ভব, কারণ রেলস্টেশনটি দর্শনীয় স্থানের কাছেই অবস্থিত। তবে সব ট্রেন সেখানে থামে না, তাই আগে সময়সূচি দেখে যাত্রা পরিকল্পনা করা ভালো। সব মিলিয়ে পাহাড়পুর যাওয়ার ভ্রমণপথ সহজ, আর ভ্রমণ নিজেই হয়ে ওঠে এক স্মৃতিময় অভিজ্ঞতা।

ভ্রমণ সতর্কতা
পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার ভ্রমণের সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা মেনে চলা উচিত, যাতে ঐতিহাসিক এই নিদর্শনের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং দর্শনার্থীর অভিজ্ঞতাও হয় নিরাপদ ও সুন্দর। প্রথমত, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো স্পর্শ করা, তার উপর উঠা বা হেলান দেওয়া একেবারেই নিষিদ্ধ, কারণ এতে প্রাচীন স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, পুরো এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অবস্থাতেই ময়লা, প্লাস্টিক বা খাবারের প্যাকেট ফেলা যাবে না। নির্দিষ্ট ডাস্টবিন ব্যবহার করা উচিত।
এ ছাড়া এই জায়গার পরিবেশ শান্ত ও ভাবগম্ভীর হওয়ায় উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা, গান বাজানো বা মাইক ব্যবহার করা অনুচিত। এটি শুধু অন্য দর্শনার্থীদের জন্যই নয়, স্থানটির প্রাচীনতা ও ধর্মীয় গুরুত্বের কারণেও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। প্রবেশের সময় সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী টিকিট সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক এবং কোনো ধরনের অনিয়ম এড়িয়ে চলা উচিত। অনেক সময় পর্যটকরা গাইড নিয়ে পুরো স্থানটি ঘুরে দেখেন—তবে গাইড নির্বাচনেও সচেতন থাকতে হবে।
জায়গাটি ভ্রমণের সময় নিজ দায়িত্বে চলাফেরা করতে হবে, বিশেষ করে শিশু বা বয়স্ক কাউকে সঙ্গে নিয়ে গেলে তাদের নিরাপত্তার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। এসব সাধারণ সতর্কতা মানলে পাহাড়পুর ভ্রমণ হবে আনন্দদায়ক, নিরাপদ এবং ঐতিহ্যের প্রতি সম্মানসূচক।

নওগাঁর অন্যান্য দর্শনীয় স্থান
নওগাঁ জেলার পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের ধশাপাশি আরও কিছু দর্শনীয় স্থান আছে। যেমন- জেলার বদলগাছী উপজেলায় অবস্থিত জগদল্লা রাজবাড়ি ও এর পাশে থাকা পুরোনো মন্দির এলাকাটি ইতিহাসপ্রেমীদের আকর্ষণ করে। মহাদেবপুরে অবস্থিত আত্রাই নদী ও এর আশপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্যও দর্শনার্থীদের জন্য মনোরম।
আত্রাই উপজেলার মসজিদভিটা মসজিদ ও রাণীনগরের আলীপুর জমিদার বাড়ি স্থানীয় ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। পত্নীতলা উপজেলার নিমইল জমিদার বাড়ি, ধামইরহাটের আম্রকানন ও বনাঞ্চল এবং সাপাহার উপজেলার পাহাড়ি টিলার প্রাকৃতিক দৃশ্য পর্যটকদের টানে। এ ছাড়া ধামইরহাটে অবস্থিত আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যান অন্যতম একটি প্রাকৃতিক আকর্ষণ, যেখানে গভীর বন ও পাখির কলতান মিলেমিশে এক অনন্য পরিবেশ বিরাজ করে। সব মিলিয়ে নওগাঁর প্রাচীন ঐতিহ্য, জমিদার আমলের স্থাপত্য এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব মিশ্রণে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য একটি চমৎকার গন্তব্য।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।