বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে। অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ ১২টি সূচকে অগ্রগতি হলেও মূল্যস্ফীতি ও মাথাপিছু ঋণসহ ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে অবনতি হয়েছে। এসব সূচকে তীব্র অবনতি ও শঙ্কার চিত্র ফুটে উঠেছে।
সোমবার রাজধানীর একটি মিলনায়তনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘সরকারের ছয় মাস: পারফরম্যান্স পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ডায়ালগে এসব তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
সিপিডি বলছে, নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন সরকারের ১৮০ দিন বা ছয় মাস পূর্ণ হলেও দেশের অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত গতিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমে ৩ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি শিল্প খাতে দীর্ঘদিনের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নতুন বিনিয়োগ থমকে আছে।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় মূল্যস্ফীতি, তারল্য সংকট ও অস্থিতিশীল বাজারের যে চ্যালেঞ্জগুলো ছিল, ছয় মাস পরও সেগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে সিপিডি।
সংস্থাটির গবেষণায় সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি সূচকে অগ্রগতি দেখা গেলেও ১৯টি সূচকে অবনতি হয়েছে।
অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর গতি আশানুরূপ নয়
গত ছয় মাসের অর্থনীতি ও সুশাসনের পারফরম্যান্স নিয়ে মূল্যায়ন তুলে ধরে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রধান দুটি প্রত্যাশা ছিল—অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু গত ছয় মাসের সার্বিক পর্যালোচনায় এ দুটির কোনোটিতেই আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং উভয় প্রত্যাশা নিয়েই এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, বিগত সরকারের কাছ থেকে বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। টাকা সংকট, ব্যাংকিং খাতের করুণ অবস্থা, অনাদায়ী ঋণ, অর্থ পাচার ও রাজস্ব ঘাটতির মতো বড় চ্যালেঞ্জ সরকারের সামনে ছিল। তবে এসব সংকট সামলে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে আশানুরূপ গতি দেখা যায়নি।
সুশাসন ও প্রশাসনিক দুর্বলতা
সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সিন্ডিকেট এবং ‘মব কালচার’ বন্ধ করাই ছিল সরকারের মূল লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি থাকলেও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে পদায়ন করা হয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের পক্ষ থেকে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করা হলেও দেশে মব ভায়োলেন্স অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান দেবপ্রিয়। নারী, শিশু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর প্রতিরোধ দেখা যায়নি।
গুম ও মানবাধিকার রক্ষায় তৈরি আইনেও নানা ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিশেষ করে আইন ভঙ্গকারীকে দিয়ে অনুসন্ধান করানোর কারণে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন ড. দেবপ্রিয়।
সংকটের সমন্বিত তথ্য নেই
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও জানান, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কী কী সংকট পেয়েছিল, তার কোনো সুনির্দিষ্ট একীভূত দলিল বা নথিপত্র তৈরি করা হয়নি। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে সংকটের কথা বলা হলেও এর পক্ষে তথ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে না।
কিছু পদক্ষেপে প্রশংসা
তবে সরকারের কিছু পদক্ষেপের প্রশংসাও করেছেন সিপিডির এই ফেলো। তিনি বলেন, এমপিদের গাড়ি ও প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যা মামলার দ্রুত বিচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর বিষয়গুলো স্বস্তিদায়ক।
তবে সার্বিকভাবে অর্থনীতিকে দ্রুত সচল করতে হলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচির দিকে যেতে হবে বলে মত দেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।


