বিশেষ দিন মানেই বিশেষ আয়োজন। সেই আয়োজনে সব সময় পরিবারের মধ্যমণি হয়ে থাকত খায়রাতুন হিয়া (৮)। নিজের কিংবা বাবা-মায়ের জন্মদিন হলে তো কথাই নেই। বাবা মানেই সব আবদার পূরণ। আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর ছিল হিয়ার মায়ের জন্মদিন। দিনটি বিশেষভাবে উদ্যাপন করতে বাবার সঙ্গে গোপনে পরিকল্পনা করেছিল ছোট্ট হিয়া। ঠিক হয়েছিল, পরিবারের সবাই মিলে সাজেক যাবে।
মায়ের সঙ্গে মিলিয়ে হিয়ার জন্য নতুন জামা কিনে দিয়েছিলেন বাবা। মাকে চমকে দিতে পছন্দের বিশেষ কেকেরও ব্যবস্থা করা হয়েছিল। নিজের হাতে জন্মদিনের কার্ডও বানিয়েছিল হিয়া।
কিন্তু ছোট্ট হিয়ার আর সাজেক যাওয়া হলো না। উদ্যাপন করা হলো না মায়ের জন্মদিনও। ডেঙ্গু কেড়ে নিল বাবা-মায়ের আদরের একমাত্র কন্যা হিয়ার প্রাণ। মায়ের সঙ্গে পরার জন্য কেনা সেই নতুন পোশাকের বদলে শেষ পর্যন্ত হিয়ার পরনে উঠল সাদা কাফনের কাপড়।
গত সপ্তাহে প্রথমে জ্বরে আক্রান্ত হন হিয়ার মা শাহিনা মনা। পরীক্ষায় ডেঙ্গু পজিটিভ ধরা পড়ে। পরদিন জ্বর আসে হিয়ারও। পরীক্ষায় তারও ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এরপর মা-মেয়েকে একসঙ্গে আগারগাঁওয়ের লায়ন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
মায়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা কমে ২০ হাজারে নেমে আসে। তখনো হিয়ার প্লাটিলেট স্বাভাবিক ছিল। তবে সে খাবার খেতে পারছিল না; কিছু খেলেই বমি হচ্ছিল। এরপর হঠাৎ তার অবস্থার অবনতি হয়। লায়ন্স হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে হিয়াকে ধানমন্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ সময় নিজের চিকিৎসার দিকে তাকানোর মতো অবস্থায় ছিলেন না হিয়ার মা। হাসপাতাল থেকে দ্রুত ছাড়পত্র নিয়ে মেয়ের কাছে ইবনে সিনায় ছুটে আসেন তিনি।
ক্রমেই হিয়ার অবস্থার অবনতি হতে থাকে। গতকাল রাতে খিঁচুনি ও বমি শুরু হলে সংকটাপন্ন অবস্থার কথা বুঝতে পেরে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাকে দ্রুত লাইফ সাপোর্টে নেন। ভোরে মেয়ের জীবন বাঁচাতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলেন মা। এর মধ্যেই মারা যায় হিয়া।
পরিবার ও স্বজনেরা জানান, হিয়াদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে। তার বাবা খোকন একটি সরকারি দপ্তরে চাকরি করেন।
ইট-পাথরের ঢাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই সহপাঠীদের প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠেছিল হিয়া। তার বন্ধুদের একজন সুহায়লা জাইমা। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির সময় দুজনের স্কুল বদলে যায়। হিয়া ভর্তি হয় মিরপুরের মনিপুর স্কুলে, আর জাইমা ভর্তি হয় আসাদগেটের ওয়াইডব্লিউসিএ স্কুলে।
স্কুল বদলে গেলেও হিয়া ও জাইমার বন্ধুত্বে ভাটা পড়েনি। প্রায় প্রতিদিনই তারা বন্ধুদের সঙ্গে গ্রুপ কলে কথা বলত, গল্প করত।
গতকাল হিয়ার সংকটাপন্ন অবস্থার কথা জানতে পেরে বন্ধু জাইমা বাবা-মায়ের কাছে আবদার করে, স্কুলে যাওয়ার আগে সে একবার প্রিয় বন্ধুকে দেখতে চায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে বাবার সঙ্গে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে হিয়ার সুস্থতার জন্য দোয়া করে জাইমা।
সাড়ে ৭টার দিকে প্রস্তুত হয়ে বের হওয়ার সময়ই খবর আসে, হিয়া আর বেঁচে নেই। খবরটি শুনে নিজের বাসাতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে ছোট্ট জাইমা। পরে হাসপাতালে গিয়ে হিয়ার বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। বারবার বলতে থাকে, ‘আই মিস ইউ হিয়া, আই লাভ ইউ সো মাচ।’
হিয়ার মাকে জড়িয়ে ধরে জাইমা বলে, ‘আমাদের তো বড় হয়ে একসঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার কথা, রেস্টুরেন্টে বসব, একসঙ্গে পড়ব, ঘুরব—কিছুই যে আর হবে না!’
ছোট্ট জাইমার এসব কথা শুনে ডুকরে কেঁদে ওঠেন হিয়ার মা শাহিনা মনা। তিনি বলেন, ‘আর যে কিছুই হওয়ার নয়, হিয়াকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি মা…।’
এদিকে শোকে যেন পাথর হয়ে গেছেন হিয়ার বাবা খোকন। তাঁর চোখে কোনো জল নেই। মেয়েকে ঘিরেই জীবনের ছন্দ ও গল্প সাজিয়েছিলেন তিনি। মেয়ের সুবিধার কথা ভেবে স্কুলের পাশেই নতুন একটি ফ্ল্যাট কিনেছিলেন। সেই ফ্ল্যাটে আর থাকা হলো না তাঁর ছোট্ট সোনামণির।
খোকন জানান, নতুন কেনা ফ্ল্যাটটি সবে গোছানো শেষ হয়েছে। মায়ের জন্মদিন একান্তে উদ্যাপন করতে মেয়ের সাজেক যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। সে অনুযায়ী বাবা-মেয়ে মিলে ‘সাজেক মিশন’-এর গোপন পরিকল্পনাও করেছিলেন।
খোকন বলেন, ‘অফিসে আগাম ছুটি চেয়ে রেখেছি। মা-মেয়ের ম্যাচিং করে জামাও কিনে দিয়েছি। কাল-পরশুর মধ্যে টিকিটটাও কাটার কথা ছিল। এর মধ্যেই সব এলোমেলো হয়ে গেল। প্রথমে স্ত্রী, এরপর হিয়া ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলো। ভাবছিলাম, দুজনেই সুস্থ হয়ে ফিরবে। একেবারেই যে সব শেষ হয়ে যাবে, কে জানত।’
এরপর হঠাৎ তীব্র আহাজারি করে ওঠেন খোকন। চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘এমন তো কথা ছিল না মা, কেন এমন করলে মা। কেন আমাকে ছেড়ে, আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেলে। আমাদের না সাজেক যাওয়ার কথা ছিল, মা… ও মা!’
ইবনে সিনা হাসপাতালের আইসিইউর সামনে তখন নেমে আসে নীরবতা। হিয়ার শোক ছুঁয়ে যায় সেখানে থাকা অন্য রোগীদের স্বজনদেরও। এর মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে হাসপাতালে আসেন হিয়ার নানা।
আদরের নাতনিকে আইসিইউ থেকে বের করে আনার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। আক্ষেপ করে বলেন, ‘আল্লাহ, এত মানুষের চোখের পানি, দোয়া, আহাজারি তুমি শুনলে না!’
একে একে হাসপাতালে আসতে থাকেন পরিচিতজন ও আত্মীয়-স্বজনেরা। কাফনের সাদা কাপড়ে মোড়ানো হিয়ার নিথর দেহ যখন অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হচ্ছিল, তখন আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ে বন্ধু জাইমা। হিয়ার কাফনে মোড়ানো দেহ জড়িয়ে সে বলে, ‘আই উইল সি ইউ এগেইন হিয়া।’
ডেঙ্গু মশার কামড়ে ঢাকায় প্রায় প্রতিদিনই হিয়ার মতো প্রাণোচ্ছল শিশু মারা যাচ্ছে। নীরবে স্বজন হারাচ্ছেন অনেক মানুষ। কিন্তু ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে পারছে না রাষ্ট্র। হিয়াকে দেখতে আসা স্বজনেরা প্রশ্ন তুলেছেন, কর্তৃপক্ষ আসলেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে আন্তরিকভাবে কাজ করছে কি না, নাকি লোক দেখানো কিছু কার্যক্রম চালিয়ে দায় সারছে।


