হাইস্কুলে পড়ালেখার পাশাপাশি টাকা আয় করার চিন্তা মাথায় আসে কামরুল হাসান সৈকতের (২২)। কিন্তু কীভাবে সেই পথ তৈরি হবে, তা তিনি জানতেন না। উপায় খুঁজতে থাকেন। হঠাৎ একদিন ইউটিউবে মাশরুম চাষের ভিডিও চোখে পড়ে। সেখান থেকেই নতুন সম্ভাবনার দিশা পান এই তরুণ।ইউটিউবের ভিডিও দেখে আগ্রহ জন্মায় মাশরুম চাষে। সিদ্ধান্ত নেন বাস্তবে শুরু করবেন। শেখার জন্য তিনি চলে যান মাগুরায়। সেখানে বাবুল আক্তার নামে এক অভিজ্ঞ চাষির কাছ থেকে মাশরুম উৎপাদনের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে শুরু হয় তার উদ্যোক্তা হয়ে উঠার পথচলা।কামরুল হাসান সৈকতের বাড়ি পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী ইউনিয়নের বাঘইল পূর্বপাড়া এলাকায়। তার বাবার নাম মো. সাজেদুল প্রামাণিক। বাঘইল ২ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন তিনি। এরপর বাঘইল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে ভর্তি হন পাবনা পলিটেকনিক্যাল কলেজে। চলতি বছর সেখান থেকে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেছেন।
২০২৪ সালের শেষ দিকে বাড়ির পাশে নিজেদের পাঁচ কাঠা জমির ওপর স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শে মাশরুম খামার গড়ে তোলেন সৈকত। শুরুতে বিনিয়োগ করেন ৭০ হাজার টাকা। মাত্র ২০টি সিলিন্ডারে মাশরুম চাষ শুরু হয়। এসব সিলিন্ডার মূলত পলিথিনে মোড়ানো স্পঞ্জ প্যাকেট।পাকশী ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুজন কুমার রায় বলেন, ‘মাশরুম চাষের ঘর ছায়াবৃক্ষ এলাকায় হওয়া দরকার। ঘরের আর্দ্রতা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ রাখতে হবে। গরমকালে দিনে ৫ থেকে ৬ বার এবং শীত ও বর্ষায় ৪ থেকে ৫ বার অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী পানি স্প্রে করতে হয়। একটি মাদার কালচার থেকে ১৫ থেকে ২০টি সিলিন্ডার তৈরি করা যায়। সিলিন্ডারে অঙ্কুর বের হওয়ার ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে মাশরুম পরিপূর্ণ হয়।’
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, টিনের ছাউনি দেওয়া ঘরের ভেতরে সারি সারি ঝুলানো সিলিন্ডার। প্রতিটি সিলিন্ডার এক এক করে পর্যবেক্ষণ করে পরিচর্যা করছেন সৈকত। পারিশ্রমিক ছাড়াই তাকে সহযোগিতা করছেন তার সহপাঠী ইভান মাহমুদ। তিনি পাবনা পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের ছাত্র।ইভান মাহমুদ বলেন, ‘সৈকত খুবই কর্মঠ। নিজের পরিশ্রমে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন তার। সে যেভাবে এগোচ্ছে, বেশিদিন লাগবে না লক্ষ্যে পৌঁছাতে। আমি চাই সে সফল হোক।’
মাশরুম চাষি কামরুল হাসান সৈকত বলেন, ‘ইউটিউবে ভিডিও দেখে মাশরুম আবাদে আগ্রহী হই। বাড়ির পাশের পাঁচ কাঠা জমিতে দুটি ঘর তৈরি করেছি। বাবার কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা নিয়ে ২০টি সিলিন্ডার দিয়ে কাজ শুরু করি।’ তিনি জানান, এখন তার খামারে সিলিন্ডারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০০-তে। লক্ষ্য রয়েছে এটি ৪ হাজারে উন্নীত করার।সৈকত বলেন, ‘প্রতিদিন গড়ে ১০ কেজি মাশরুম উৎপাদন হয়। মাসে উৎপাদন প্রায় ৩০০ কেজি। প্রতিকেজি ৩০০ টাকা দরে প্রতিদিন বিক্রি হয় ৩ হাজার টাকা। মাসে বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় ৯০ হাজার টাকা।’ উৎপাদন ও আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে প্রতিমাসে তার নিট আয় প্রায় ২৫ হাজার টাকা। তিনি আরও বলেন, ‘সিলিন্ডারের ভেতরে খড়, কাঠের গুঁড়া ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করা হয়। সেগুলো খামারের ভেতরে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ২৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে মাশরুম পূর্ণতা পায়। এক সপ্তাহ পর বিক্রির উপযোগী হয়।’ ঈশ্বরদী ছাড়াও ঢাকা, রাজশাহী, নাটোরসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় তার ক্রেতা রয়েছে। অর্ডার পেলে মাশরুম পৌঁছে দেওয়া হয়। সৈকত বরেন, ‘রূপপুর প্রকল্পে কর্মরত কয়েকজন রাশিয়ান নাগরিক নিয়মিত আমার কাছ থেকে মাশরুম কিনছেন। তারা প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ কেজি করে নেন।’
পাকশীর বাঘইল ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মতিয়ার রহমান বলেন, ‘সৈকত মাশরুম চাষ শুরু করে এখন স্বাবলম্বী হওয়ার পথে। সে একজন পরিশ্রমী উদ্যোক্তা। আমাদের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। তার খামার দেখে এলাকার অনেকেই আগ্রহী হচ্ছেন।’ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আবদুল মমিন বলেন, ‘মাশরুম একটি পুষ্টিকর খাবার। এটি হৃদরোগ ও ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়ক। সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকার কাজ করছে। সৈকতের খামার আমি পরিদর্শন করেছি। পড়ালেখার পাশাপাশি সে অত্যন্ত পরিশ্রমী ও উদ্যোগী। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা আগেও ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। আশা করছি, সে মাশরুম চাষে আরও সফল হবে।’

