বরেন্দ্র অঞ্চলের রুক্ষ মাটি ও অনিয়মিত বৃষ্টির সঙ্গে লড়াই করে কৃষকের টিকে থাকার গল্প পুরোনো। বছরের পর বছর ধাননির্ভর কৃষিই ছিল ভরসা। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজারঝুঁকিতে সেই ভরসায় ফাটল ধরেছে। এই প্রেক্ষাপটে রাজশাহী অঞ্চলের কৃষিতে নতুন আশার আলো হয়ে উঠেছে মিশ্র চাষ পদ্ধতি। একই জমিতে ফলগাছের ছায়ায় সবজি ও অন্যান্য ফসল একসঙ্গে চাষ হচ্ছে।
রাজশাহীর আমবাগানে এখন শুধু আম নয়, শসা, লাউ, মরিচ ও ফুলকপির সারি দেখা যায়। মাল্টা ও ড্রাগন ফলের বাগানে বেড়ে উঠছে বাঁধাকপি, বরবটি ও পেঁপে। কৃষকদের ভাষ্য, এক জমিতে দুই-তিনটি ফসল মানে ঝুঁকি কম, লাভ বেশি।
সরেজমিনে দেখা যায়, আম, মাল্টা, লেবু, পেয়ারা ও ড্রাগন ফলের মতো অর্থকরী ফলগাছের সঙ্গে শসা, বেগুন, পেঁপে, মুলা, বরবটি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাল শাক, মরিচ, পটোল, লাউ ও করলা মিশ্রভাবে চাষ হচ্ছে। এতে জমির এক ইঞ্চিও ফাঁকা থাকছে না।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একই জমিতে একাধিক ফসলের কারণে আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। কোনো একটি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য ফসল ক্ষতি পুষিয়ে দিচ্ছে। ফলে উৎপাদন ঝুঁকি কমেছে।
চারঘাট উপজেলার কৃষক জামাল হোসেন বলেন, ‘গত কয়েক বছর শুধু ধান চাষ করে অনেকেই লোকসান গুনেছেন। খরা ও অনাবৃষ্টিতে কিছুই ঠিক থাকে না।’
ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তিনি আমবাগানের সঙ্গে ধান, পেঁয়াজ, রসুন, বেগুন, সরিষা, হলুদ ও পেঁপে চাষ শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘মিশ্র চাষে আমের ফলন বা গুণগত মান নষ্ট হয় না, বরং মাটিও ভালো থাকে।’
আট বিঘার আমবাগানে মৌসুমি ফসল চাষ করে এখন তিনি নিয়মিত বাড়তি আয় করছেন।
পবা উপজেলার হুজরিপাড়া গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা প্রকৌশলী সরওয়ার জাহান ২০২০ সালে ৯ বিঘা জমিতে মাল্টার বাগান করেন। চলতি মৌসুমে বাগানের ফাঁকা জায়গায় ফুলকপি, বাঁধাকপি ও কাঁচা মরিচ চাষ করেছেন। তিনি মরিচ বিক্রি থেকে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা এবং মাল্টা বিক্রি থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় করেছেন।
তিনি বলেন, ‘একই জমি থেকে একাধিক ফসল মানে পুঁজি দ্রুত ঘোরে। সবজি বিক্রি করে নগদ টাকা আসে, ফল বিক্রি হয় পরে।’ ফসল কাটার পর কুমড়া ও শসার চারা রোপণের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তিনি।
একই উপজেলার পুঠিয়াপাড়া গ্রামের মাদ্রাসাশিক্ষক মোফাক্কার হোসেন তিন বিঘার ড্রাগন ফলের বাগানে ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘ড্রাগন ফলের সঙ্গে সবজি চাষ আমার জীবনে বড় পরিবর্তন এনেছে।’
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আধুনিক সেচব্যবস্থা, সঠিক ছাঁটাই, সুষম সারব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই দমনে প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি ব্যবহারে মিশ্র চাষে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। ফলের গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখেই অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এম এ মান্নান বলেন, ‘কৃষকরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন ও প্রযুক্তিনির্ভর। প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে আমরা মিশ্র চাষে উদ্বুদ্ধ করছি।’ এতে উৎপাদন ব্যয় কমছে ও লাভ বাড়ছে।
রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘মিশ্র ফসল চাষ বর্তমান কৃষিব্যবস্থার জন্য সময়োপযোগী। কম সময়ে একই জমি থেকে একাধিক ফসল পাওয়া যায়। মাটির উর্বরতাও বজায় থাকে।’
তিনি জানান, চলতি মৌসুমে সরকারি হিসাবে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে মিশ্র পদ্ধতিতে সবজি চাষ হয়েছে। এই পরিসর প্রতিবছরই বাড়ছে।

