উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় সবজি বাজার মহাস্থানহাট। শীত মৌসুমে এই হাট থেকেই সারা দেশে সবজি সরবরাহ হয় সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সারা বছরই মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে চাষির হাত থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত যেতে সবজির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। উৎপাদক ন্যায্যমূল্য পান না। ভোক্তাকেও দিতে হয় বাড়তি দাম।
প্রায় ৫০ বছর ধরে মহাস্থানহাট থেকে সবজি পাঠান আয়নুল হক। তিনি দেশের অন্তত ১০টি জেলায়, রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় সবজি সরবরাহ করেন। তার হিসাবে, মহাস্থানহাট থেকে সবজি পাঠাতে এলাকাভেদে সর্বোচ্চ খরচ হয় প্রতি কেজি সাড়ে ৫ টাকা। দূরত্ব কম হলে খরচ আরও কমে। খরচের খাত সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘গ্রেডিং, প্যাকেজিং ও লেবার খাতে প্রতি কেজিতে গড়ে ২ টাকা ৫০ পয়সা লাগে। পরিবহনে লাগে আরও প্রায় ২ টাকা। তবে চাহিদা কম থাকলে ট্রাকভাড়া কমে যায়।’
তার দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে মানভেদে ৩৭ কেজির কিছু বেশি ওজনের ফুলকপি বিক্রি হয়েছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। এখন সেই একই ওজনের ভালো মানের ফুলকপির দাম নেমে এসেছে ৪০০ টাকার নিচে।
গত বুধবার তিনি প্রায় ১ হাজার ৯০০ কেজি ফুলকপি কিনেছেন দেড় লাখ টাকায়। পাঠাতে খরচ পড়েছে প্রতি কেজি ৫ টাকার নিচে। সব মিলিয়ে ঢাকায় এক কেজি ফুলকপি পাঠাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১ টাকা। অথচ ঢাকার খুচরা বাজারে এই ফুলকপি বিক্রি হবে এলাকাভেদে ২০ থেকে ২৫ টাকায়।
মহাস্থানহাটের আরেক পাইকারি বিক্রেতা মো. নিরব প্রতিদিন গড়ে ৭০০ কেজি টমেটো বিক্রি করেন। তার দোকানে মজুত থাকে অন্তত আড়াই হাজার কেজি টমেটো। তিনি রাজশাহী ও নওগাঁর বিভিন্ন বাজার থেকে চাষি ও পাইকারদের কাছ থেকে টমেটো সংগ্রহ করেন।
ওই দুই জেলায় প্রতি কেজি টমেটোর দাম পড়ে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। অন্যান্য খরচ যোগ করে মহাস্থানহাট পর্যন্ত আনতে এক কেজির দাম দাঁড়ায় কখনো ৪০, কখনো ৪৫ টাকা। মহাস্থানহাটে পাইকারি বাজারে তিনি বিক্রি করেন ৬০ টাকা কেজি দরে।
গাবতলী উপজেলার বাদোপাড়া গ্রামের এই ব্যবসায়ী জানান, তার কাছ থেকে নিয়মিত টমেটো নেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন। তার হিসাবে, মহাস্থানহাট থেকে গোবিন্দগঞ্জ বাজারে টমেটো নিতে খরচ হয় প্রতি কেজি ৪ টাকা। সেখানে খুচরা বাজারে টমেটো বিক্রি হয় ৭০ থেকে ৭৫ টাকা কেজিতে। পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চাষির হাত থেকে ভোক্তার ঘরে পৌঁছাতে এক কেজি সবজির দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। এই পথে অন্তত চারজন মধ্যস্বত্বভোগীর হাত ঘোরে।
মো. নিরব বলেন, ‘প্রথমে চাষির কাছ থেকে কেনেন স্থানীয় পাইকাররা। এরপর যায় ঢাকা বা অন্য এলাকার কমিশন এজেন্টদের হাতে। তারপর আবার পাইকারি বাজারে আসে। সব শেষে যায় খুচরা বাজারে।’ দাম বাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সবজির ধরন, আকার, মান ও দূরত্বের ওপর বিষয়টি নির্ভর করে। সাধারণত দাম বাড়ে ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত। তবে মৌসুমের শুরুতে শীতকালীন সবজির দাম আরও বেশি হয়।’
শিবগঞ্জ উপজেলার মাঝিহট্ট এলাকার চাষি আরিফুর রহমান এ মৌসুমে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ করে শিম চাষ করেছেন। মৌসুমের শুরুতে তিনি প্রতি কেজি শিম বিক্রি করেছেন ১০০ টাকায়। এখন সেই শিমই পাইকারদের কাছে বিক্রি হচ্ছে ২৫ টাকা কেজিতে। নিজের শ্রম ও জমির ভাড়ার হিসাব না করায় মৌসুমের শুরুতে দাম বেশি পাওয়াকে তিনি লাভ বলে মনে করেছেন।
শীতের আকর্ষণীয় সবজি নতুন আলুর দরও এ বছর কম। শিবগঞ্জ উপজেলার লালদহ গ্রামের মাহবুবুর রহমান জানান, গত মৌসুমে তিনি প্রতি কেজি আলু বিক্রি করেছেন ৮০ টাকায়। এবার একই আলু বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা কেজিতে। মহাস্থানহাটের মিষ্টি কুমড়ার ব্যবসায়ী এরফান আলী বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরেই এই সবজির দাম নেই। গত মাসে তিনি প্রতি কেজি মিষ্টি কুমড়া বিক্রি করেছেন ২৩ থেকে ২৪ টাকায়। এখন তা নেমে এসেছে ১৬ থেকে ১৭ টাকায়। মহাস্থানহাট সবজি ও মসলার জন্য সারা দেশে পরিচিত। সড়ক যোগাযোগ ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলার বড় মোকাম থেকে এখানে কমিশন এজেন্টরা কাজ করেন। হাটে অন্তত ৫০টি কমিশন এজেন্ট সক্রিয়।
দীর্ঘদিনের কমিশন এজেন্ট আইনুল হক জানান, হাটের খাজনা ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে এক কেজি সবজিতে ব্যয় হয় প্রায় ৩ টাকা। তিনি বলেন, ‘সবজি ভেদে প্রতি কেজিতে কমিশন দিতে হয় ২৫ পয়সা থেকে ১ টাকা পর্যন্ত। চাহিদা বাড়লে কিছু সবজি ও মসলায় কমিশনও বাড়ে।’ শীতকালে এই হাট থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে ৫ হাজার টন সবজি বেচাকেনা হয়।
সবজি চাষি সামছুল জানান, পনেরো দিন আগেও ৫ কেজি ওজনের একটি লাউ তিনি বিক্রি করেছেন ৪০ টাকায়। এখন একই লাউ ২০ টাকাতেও নিতে চায় না কেউ। শিবগঞ্জ উপজেলার পানিকান্দা গ্রামের এই চাষি বলেন, তার কাছ থেকে কেনা লাউ মহাস্থান বাজারেই পাইকাররা বিক্রি করেন ২৫ থেকে ৩০ টাকায়। তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকায় যারা পাঠান তারা আমাদের কাছ থেকে ১৫ বা ২০ টাকায় কেনা লাউ ঢাকায় খুচরা বাজারে ৬০ টাকায়, কখনো আরও বেশি দরে বিক্রি করেন।’
চক মহাস্থান গ্রামের চাষি মোকসেদ আলী গত বুধবার প্রায় আড়াই কেজি ওজনের ১০২টি বাঁধা কপি নিয়ে হাটে আসেন। সকাল ৮টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টায় কোনো ক্রেতা পাননি। পরে যারা আগ্রহ দেখিয়েছেন তারাও খুব কম দাম বলেছেন। তিনি বলেন, ‘দুই সপ্তাহ আগে যে বাঁধা কপি ২০ থেকে ২২ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এখন দাম বলছেন ১২ টাকা। অর্থাৎ এক কেজি বাঁধা কপির দাম মাত্র ৪ টাকা।’
বাজারে নতুন পেঁয়াজ উঠলেও দরে স্বস্তি ফেরেনি। এখনো কাঁচা পেঁয়াজ কেজিতে বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা।

