রাজশাহীতে আবার ফিরছে ‘সোনালি আঁশ’ পাটের সুদিন। জেলায় প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৪ হাজার টাকায়, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ দাম। এতে কৃষকের মুখে ফুটেছে হাসি। জমে উঠেছে হাটবাজার। অনুকূল আবহাওয়ায় ফলনও হয়েছে ভালো। কৃষকরা বিঘাপ্রতি ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করছেন। জেলা কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বাজার স্থিতিশীল থাকলে আগামী মৌসুমে আবাদ আরও বাড়বে।
রাজশাহীর নওহাটা, কেশরহাট, কাকনহাট, বানেশ্বর, তাহেরপুর ও তানোরসহ বিভিন্ন হাটে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে পাটের রমরমা বেচাকেনা। ফড়িয়াদের পাশাপাশি রাজশাহীর পাঁচটি বেসরকারি জুট মিল সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে পাট কিনছে। এতে প্রতি মণে কৃষকরা গত বছরের তুলনায় দেড় হাজার টাকারও বেশি দাম পাচ্ছেন।
পবা উপজেলার নওহাটার পাট ব্যবসায়ী মুকুল আহমেদ বলেন, ‘গত বছর মণপ্রতি পাট বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায়। এবার দাম বেড়ে ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৪ হাজার টাকায় উঠেছে। বাজারে নতুন প্রাণ ফিরেছে, কৃষকরাও উৎসাহী হচ্ছেন।’
পুঠিয়ার বানেশ্বর এলাকার কৃষক কালাম বলেন, ‘বীজ, সার, শ্রমিক, সেচ, জমি লিজ- সব খরচ মিলে বিঘাপ্রতি ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ হাজার টাকা। আবহাওয়া ভালো থাকায় ফলনও ভালো পেয়েছি। বিঘায় ৯ থেকে ১০ মণ পাট তুলেছি। খরচ বাদে বিঘাপ্রতি লাভ হয়েছে ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা।’
জেলার অন্য চাষিরাও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। অনেকেই বলছেন, কয়েক বছর পর এবার তারা প্রকৃত লাভের মুখ দেখেছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২০ হেক্টর বেশি। অনুকূল আবহাওয়া ও পর্যাপ্ত বৃষ্টির কারণে গড়ে প্রতি বিঘায় ৯ থেকে ১০ মণ ফলন পাওয়া গেছে। পাটের রং ও মানও হয়েছে উন্নতমানের, যা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ভালো।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক উম্মে ছালমা বলেন, ‘এবার আবহাওয়া অনুকূলে ছিল, বাজারমূল্যও ভালো। ফলে কৃষকরা পাট চাষে লাভবান হয়েছেন। পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও লাভজনক অর্থকরী ফসল। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমরা কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত বীজ, সার ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনায় মাঠপর্যায়ে সহায়তা দিচ্ছি।’
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহানা আক্তার জাহান বলেন, ‘কৃষকের উৎপাদিত পাট যেন ন্যায্যমূল্যে বিক্রি হয়, সে জন্য বাজার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা যেন দাম কমিয়ে কৃষকের ক্ষতি না করে, সে বিষয়ে বাজার কমিটিগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রপ্তানিযোগ্য ফসল, তাই কৃষককে লাভবান রাখতে হলে বাজারব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।’
রাজশাহী পাট অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নাদিম আক্তার জানান, কৃষকদের সঠিক বাজারতথ্য দেওয়া, অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ২০১০ সালের বাধ্যতামূলক পাটজাত মোড়ক আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা পাটের স্থিতিশীল বাজার নিশ্চিত করছি। সরকার কাঁচা পাট রপ্তানির সুযোগও উন্মুক্ত রেখেছে, যাতে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পান।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজশাহীতে বর্তমানে সাতটি জুট মিল রয়েছে, এর মধ্যে পাঁচটি সচল। এসব মিলের মধ্যে পুঠিয়ার রহমান জুট স্পিনার্স প্রতিদিন ১০০ মেট্রিক টন উৎপাদন করে। রহমান জুট মিল উৎপাদন করছে ২০ মেট্রিক টন, হাসেন জুট মিল ১৮ মেট্রিক টন, নওহাটা জুট মিল ও আমান জুট ফাইবার্স প্রতিদিন ১৫ মেট্রিক টন করে উৎপাদন করছে। বাকি দুটি মিল বন্ধ রয়েছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাটের এ ধারাবাহিক সাফল্য বজায় রাখতে হলে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি পাটশিল্পের আধুনিকায়ন জরুরি। রপ্তানিবাজারে টিকে থাকতে পাটজাত পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের এই খাতে আকৃষ্ট করতে হবে।

