লক্ষ্মীপুরে দিন দিন বাড়ছে সুপারি উৎপাদন। চাষিদের আগ্রহ, বাজারে বাড়তি চাহিদা এবং অনুকূল আবহাওয়া- এই তিন কারণে পুরো জেলায় সুপারি চাষের বিস্তার এখন চোখে পড়ার মতো। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এখানে উৎপাদিত সুপারি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। দাম ভালো থাকায় কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অন্যান্য ফসলের মতো ঝুঁকি নেই বললেই চলে। এতে চাষিরা কম খরচে ভালো লাভ তুলতে পারছেন। জেলা কৃষি বিভাগ আশা করছে, এবার সুপারির বাজারমূল্য দাঁড়াবে প্রায় হাজার কোটি টাকা।জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, পাঁচটি উপজেলায় এখন ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমিতে সুপারি চাষ হচ্ছে। এখানকার কৃষকরা বলেন, সুপারি গাছ একবার রোপণ করলেই তেমন পরিচর্যা ছাড়াই টানা ৩০ থেকে ৪০ বছর ফলন দেয়। প্রতি হেক্টরে প্রায় আড়াই থেকে তিন টন শুকনো সুপারি পাওয়া যায়। এ কারণে এই চাষকে লাভজনক ধরে নিয়ে নতুনরাও এতে ঝুঁকছেন।
এবার জেলায় প্রায় সাড়ে ২০ হাজার টন সুপারি উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল। বাজারে এখন প্রতি কাওন সুপারি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায়। এখানে ১৬ পোনে এক কাওন ধরা হয় এবং ৮০টি সুপারি মিলে হয় এক পোন। সে হিসাবে পুরো জেলার সুপারির বাজারমূল্য দাঁড়ায় হাজার কোটি টাকার মতো। গত বছর প্রতি কাওন বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। এবার দাম কাওনপ্রতি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি। কৃষকরা মনে করছেন, এই দাম আগামী বছর আরও বাড়তে পারে।আবহাওয়া অনুকূল থাকায় এবং আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করায় এ অঞ্চলে উৎপাদন ক্রমেই বাড়ছে। উৎপাদন খরচ কম থাকায় সুপারি চাষ অন্য যেকোনো ফসলের তুলনায় বেশি লাভজনক হচ্ছে। সুপারিবাগানে পোকামাকড়ের আক্রমণ বা রোগবালাইও কম। তাই নতুন চাষির সংখ্যা বাড়ছে দ্রুত।
এখানকার সুপারি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম, ঢাকা, ময়মনসিংহ, রংপুর, রাজশাহী, শ্রীমঙ্গলসহ দেশের অনেক জেলায়। পুরো জেলায় একশরও বেশি স্থানে নিয়মিত সুপারির হাট বসে। এর মধ্যে রয়েছে দালাল বাজার, রসুলগঞ্জ, চররুহিতা, ভবানীগঞ্জ, মান্দারী, জকসিন, চন্দ্রগঞ্জ, রায়পুর বাজার, হায়দারগঞ্জ ও খাসের হাট। প্রতিটি স্থানীয় বাজারেও সুপারি বিক্রি হয়। এখন চাষিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন সুপারি পাড়া, বিক্রি ও সংরক্ষণ কাজে।মান্দারীর চাষি নুরুল আমিন, মোল্লারহাটের মনির হোসেন মোল্লা এবং দালাল বাজারের নুরনবী বলেন, ‘এবার সুপারির ফলন ভালো হয়েছে। কৃষকরাও খুশি। দামও গত বছরের তুলনায় অনেক ভালো।’
তারা জানান, প্রতি কাওন বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায়। প্রকারভেদে প্রতি পোন সুপারি বিক্রি হয় ১৫০ থেকে ২৫০ টাকায়। তাদের কথায়, ‘সুপারি পরিচর্যার খরচ খুব কম। তাই লাভও বেশি।লক্ষ্মীপুর সুপারির জন্য বিখ্যাত- এ তথ্য নতুন নয়। এবার উৎপাদন ও দাম দুই-ই বাড়ায় জেলার অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলেন, ‘সুপারি গাছের পরিচর্যা লাগে কম। রোগবালাই কম হওয়ায় চাষিরা এখন বেশি ঝুঁকছেন। এতে কৃষকদের পাশাপাশি সমগ্র অর্থনীতিতেও সুফল মিলছে।’জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জহির আহমেদ বলেন, ‘এবার প্রায় ২০ হাজার টন সুপারি উৎপাদন হয়েছে। বাজারমূল্য দাঁড়াচ্ছে প্রায় হাজার কোটি টাকা।’ তিনি আরও বলেন, ‘চাষিরা এখন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। তাই ফলনও ভালো হচ্ছে। সুপারি চাষের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে এবং কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।’
কৃষি বিভাগ থেকে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে চাষিরা আরও উন্নত ফলন পেতে পারেন। সুপারি চাষকে কেন্দ্র করে লক্ষ্মীপুরের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে- এমনটাই আশা স্থানীয়দের।

