লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলায় শীতকালীন সবজি ও আগাম আলুর ফলন মোটামুটি ভালো। অনুকূল আবহাওয়ায় হাট-বাজারে নতুন আলু উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু দাম কম থাকায় কৃষক প্রত্যাশিত লাভ পাচ্ছেন না। এতে চিন্তায় পড়েছেন তারা। আলু বীজ ও সার-কীটনাশকের অতিরিক্ত দামে এ বছর উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা।
জেলার বিভিন্ন কাঁচামাল আড়ত ঘুরে দেখা গেছে, আগাম ক্যারেজ জাতের আলু পাইকারি বাজারে পাঁচ কেজির পাল্লা ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কেজিপ্রতি দাম ১৭ টাকা। হাগড়াই (বগুড়াই) জাতের আলু পাঁচ কেজির পাল্লা ১৩০ টাকা। কেজিপ্রতি দাম ২৬ টাকা। গত মৌসুমের পুরোনো লাল আলু আড়তে বস্তাপ্রতি ২৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি বস্তায় প্রায় ৬০ কেজি আলু থাকে। কেজিপ্রতি দাম প্রায় ৫ টাকা।
খুচরা বাজারেও নতুন আলুর দাম কম। শহরের গোশালা বাজার, পুরোনো বাসস্ট্যান্ড, হাড়িভাঙ্গা, বড়বাড়ী, মহেন্দ্রনগর ও বুড়ির বাজারে ক্যারেজ জাতের আলু ২০-২২ টাকা কেজি। হাগড়াই (বগুড়াই) আলু ৩০-৩২ টাকা কেজি। পুরোনো লাল আলু ৮-১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেকেই এসব পুরোনো আলু বস্তা কিনে গরু-ছাগলকে খাওয়াচ্ছেন।
আবার আগাম আলুর দাম কমে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ। আদিতমারীর দুর্গাপুর ইউনিয়নের কৃষক ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘গত বছর পাইকারি দাম ছিল ৪৫-৫০ টাকা কেজি। এখন নেমে ১৭-২৬ টাকায়।’ কালীগঞ্জের তুষভান্ডার ইউনিয়নের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ন্যায্য দাম না পেলে জীবনযাপন সংকটে পড়বে।’ হাতীবান্ধার বড়খাতা ইউনিয়নের কৃষক সাঁতার আলী বলেন, ‘আলুর রপ্তানি বাড়ালে চাহিদা বাড়বে। অতিরিক্ত সরবরাহ কমবে। দাম বাড়বে।’ দামের চাপের কারণ হিসেবে পাইকারদের বক্তব্য মিলেছে। বড়বাড়ী কাঁচামাল আড়তের পাইকার মজিদুল মিয়া বলেন, ‘পুরোনো আলুর সরবরাহ বেশি। নতুন আলুর চাহিদা কম।’ একই আড়তের আরেক পাইকার হক সাহেব বলেন, ‘বাজার সংযোগ ও তথ্যের ঘাটতিও দামে প্রভাব ফেলছে।’
আলুর ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতের উপায় নিয়ে কৃষক ও বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। আলুচাষি ও শিক্ষক আপেল উদ্দিন বলেন, ‘রপ্তানি বাড়াতে হবে। স্টক ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে হবে। কৃষক-পাইকার সরাসরি সংযোগ দরকার।’
আবুল কাশেম মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক ও আলুচাষি আপেল উদ্দিন বলেন, ‘সরকারকে রপ্তানি সম্প্রসারণ, স্টক ব্যবস্থাপনা ও সরাসরি বাজার সংযোগে জোর দিতে হবে।’ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, আগাম আলু চাষ হয়েছে ৬৫ হেক্টর জমিতে। চলতি মৌসুমে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ৬ হাজার ৫০০ হেক্টর। উৎপাদন লক্ষ্য ১ লাখ ৬৩ হাজার ১৫০ টন। ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত আগাম আলু বাদে আলু চাষ হয়েছে ৬ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে। এটি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩১০ হেক্টর বেশি। আরও জমিতে চাষ বাড়তে পারে।
উপজেলাভিত্তিক আলু চাষের হিসাবও দেওয়া হয়েছে। সদর উপজেলায় ৪ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে। আদিতমারীতে ৮৮০ হেক্টর, কালীগঞ্জে ৯৯০ হেক্টর, হাতীবান্ধায় ৬৮০ হেক্টর ও পাটগ্রামে ২৫০ হেক্টর জমিতে।
কৃষি কর্মকর্তারা ফলন নিয়ে আশাবাদী। আদিতমারীর কৃষি কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে উৎপাদন আরও বাড়বে।’ জেলা সদরের কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার সোহায়েল আহমেদ বলেন, ‘হিমাগারের পুরোনো আলু নতুন আলুর দামে চাপ তৈরি করছে।’ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাইখুল আরিফিন বলেন, ‘আবহাওয়া সহায়ক থাকলে কৃষক ন্যায্য দাম পাবেন।’

