শীতকাল আসলেই নানা ধরনের সবজির সমাহার। যেমন ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, মটরশুটি, মূলা, গাজর, টমেটো, ধনেপাতাসহ, পালংশাক ইত্যাদি নানাধরনের সবজি দেখা দেয় এ মৌসুমে। এসব সবজি যেমন আর্কষনীয় তেমনি রয়েছে পুষ্টিগুন। এসব সবজিতে বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন, খনিজ, ফাইটোক্যামিকেল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ সরবরাহ করে থাকে, যা শীতের মৌসুমের নানা সংক্রমনের বিরুদ্ধে লড়াই করে রোগ প্রতিরোধকে শক্তিশালী করে থাকে। তবে এসব সবজির গুনাগুন নষ্ট হয়ে যেতে পারে পারে যদি রান্নার পদ্ধতির ভুল হয়ে থাকে। তাই কিভাবে ভিটামিন, মিনারেলস বজায় রেখে শীতের সবজি খাওয়া যায় তা নিম্নে জেনে নেওয়া যাকঃ
রান্নায় তাপের প্রভাব দুটি কারনের উপর নির্ভর করে পুষ্টির মান পরিবর্তন হতে পারে। এক আপানি কতটা তাপে রান্না করছেন এবং অপরটি কতক্ষন রান্না করছেন। কারুন উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না করলে এর কিছু পুষ্টির মানের উপর প্রভাব ফেলবে। আবার দীর্ঘ সময়ের জন্য রান্না করলে ভিটামিন, খনিজগুলো এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বেশিরভাগ পুষ্টি হারিয়ে যায়। এছাড়া সব রান্নার পদ্ধতি পুষ্টির উপর একই প্রভাব ফেলবে না। যেমন মাইক্রেয়েতে সাধারনত কম পরিমানে পুষ্টির ক্ষতি হয়, স্টিমিং বা ভাপে মাঝারী এবং ফুটন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়।
শাকসবজি রান্নায় আরো দুটি উপাদান গুরুত্বপূর্ন, একটি পানিতে দ্রবনীয় ভিটামিন যেমন ভিটামিন বি, সি অপরটি চর্বিতে দ্রবনীয় ভিটামিন যেমন ভিটামিন এ, ডি, ই, কে। পানিতে দ্রবনীয় শাক সবজিগুলো পানিতে রান্না করলে সেই ভিটামিন কিছু পানিতে মিশে সেই মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট অক্ষন রেখে শোষনযোগ্য করে তোলে। আবার চর্বিতে দ্রবনীয় খাবারগুলো চর্বিতে রান্না করলে আরো শোষনযোগ্য করে তুলবে।
ক্রুসিফেরাস সবজি ৪ ক্রুসিফেরাস সবজি বলতে। বলতে বোঝায় কপি জাতীয় যেসব খাবার যেমন ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, ইত্যাদি। এসব সবজিতে আছে ভিটামিন কে এবং ক্যারোটিনয়েড যা সাধারনত তাপের সংস্পর্শে দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয় না। আবার সিদ্ধ ফুলকপিতে ভাপানো ফুলকপির তুলনায় গ্লুকোসিনোলেট, পলিফেনল, এবং ফ্ল্যাভোনয়েডের পরিমান কম থাকে। এছাড়া বাষ্প বা স্টিম করলে এসব সবজির অ্যান্টিঅপ্রিডেন্ট ভালো পাওয়া যায়। গবেষনা অনুসারে ফুলকপি ৫ মিনিটের জন্য পানিতে ফুটানো হলে পুষ্টির প্রায় ২০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ ক্ষতি হয়। আবার ১০ মিনিটের জন্য পানিতে ফুটালে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ক্ষতি হয়, এবং ৩০ মিনিটের জন্য পানিতে ফুটালে ৭৫ শতাংশ পুষ্টির ক্ষতি হয়। এর পরিবর্তে আলতোভাবে ভাজলে পুষ্টির মান বেশি অক্ষত থাকে। কারন রান্নাপদ্ধতি উপর নির্ভর করে ভাজা ক্রুসফেরাস সবজি মিথানোলিক নির্যাস বজায় রাখে এবং সর্বোচ্চ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এছাড়া অপর আরেকটি রান্না সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো চুলার উপর অল্প পানি, লেবুর রস, তেল দিয়ে আলতো করে ভাজলে এর পুষ্টিমানকে আরও মারও শোষনযোগ্য করে করে তুলবে।
8 টমেটো ৪ টমেটোতে লাইকোপেন থাকে যা হৃদরোগ, স্ট্রোক প্রতিরোধ, চোখের সমস্যা দূর করতে, ক্যান্সারসহ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমায়। তবে এটি কাঁচা বা ভাপে খেলে লাইকোপেনের সর্বাধিক পুষ্টি পাবেন না। টমেটোতে থাকা লাইকোপেনের সর্বাধিক পেতে হলে সেগুলি রান্না করে খেতে হবে। একটি গবেষনায় দেখা গেছে টমেটোকে অলিভ অয়েল ভাজানো হলে লাইকোপেনের মাত্রা প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়ে যায়। অপরপক্ষে একটি
অসুবিধা হলো একে দুই মিনিটের জন্য রান্না করা হলে ১০ শতাংশ ভিটামিন সি কমে যায়। আবার দুই মিনিটের জন্য টমেটো রান্না করলে প্রায় ৫৪ শতাংশ বেশি লাইকোপিন বেড়ে যায়, ৩০ মিনিট পরে আরো ১৬ শতাংশ বেশি। লাইকোপিনের পুষ্টি বুঝার জন্য গবেষকরা বলেছেন টমেটোকে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রায় পেক্ষে দুইঘন্টা গরম করলে ভালোভাবে ছেড়ে দেয়। এক কাপ কাপ রান্না করা টমেটোতে ৪৬০ মিলিগ্রাম সোডিয়াম থাকে যা দৈনিক সোডিয়াম গ্রহনের প্রায় এক পঞ্চমাংশ। তাই অতিরিক্ত গ্রহন করবে করবে না। এছাড়া কাঁচা কাঁচা টমেটো প্রচুর পরিমানে খেলে দাঁতের এনাশেল ক্ষতি করতে পারে। তাই খাওয়ার সাথে সাথে ব্রাশ করা উচিত। রান্না করা টমেটো কাঁচা টমেটো থেকে এসিডিক তাই রান্না করার সময় সামান্য বেকিং সোডা যোগকরতে পারেন অ্যাসিড মাতে। তাই সব মিলিয়ে কাঁচা বা রান্না যাই করুক না কেন শরীরের অবস্থা বঝে খেতে হবে। অম্লতা কমাতে।
মটরওটি ৪ ৪ মটরশুটিকে ভাজা, ভাজা, সিদ্ধ করার চেয়ে স্টিম করলে এর ভিটামিন মিন সি নষ্ট কম হয়। গবেষনায় দেখা গেছে, মটলণ্ডটিকে ভাজলে ৮৭ শতাংশ ভিটামিন সি নষ্ট হয় আবার সিদ্ধ করলে ৪৮ শতাংশ নষ্ট হয়, আর ৫ মিনিটের জন্য স্টিম করলে করলে ৩২ শতাং শতাংশ ভিটামিন সি নষ্ট হয়। তাই অধিক সময় ধরে এটিকে রান্না না করার পরামর্শ।
পালংশাক ৪ পালংশাকে ভালো কোলেট থাকে। আধা কাপ রান্না করা পালংশাকে ১০০ মাইক্রেগ্রাম ফোলেট থাকে। তবে ১০ মিনিট সিদ্ধ করলে ৫৮ শতাংশ ফোলেট নষ্ট হয়, যেখানে ভাজার ফলে ৫০ শতাংশ ক্ষতি হয়। আবার ৫ মিনিটের জন্য ভাপিয়ে রান্না করলে ফোলেটের কোন ক্ষতি হয় না। তাই পালংশাক রান্না করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো বাষ্প করা।
গাজর ৪ গাজরে বিটা ক্যারোটিন থাকে। গবেষনায় দেখা গেছে বিটা ক্যারোটিনের শোষন কাঁচা কাচা গাজর থেকে ৬.৫ গুন বেশি ভাজা ভাজা গাজরে। এছাড়া অল্প সময় ধরে একে সিদ্ধ করলে এর অ্যান্টিঅপ্রিডেট ঘনত্ব বাড়ে। তাই কাঁচা গাজরের তুলনায় ভাজা বা সিদ্ধ খেলে এর শোষন বাড়বে। আবার কাচাঁ গাজর কারো ক্ষেত্রে উপকার। কাঁচা গাজরে চিনির পরিমান কম থাকে। তাই যাদের ডায়াবেটিস আছে বা ওজন কমাতে চান তারা কাঁচা গাজর খেতে পারেন। তবে অবশ্যই পরিমানমত।
8 খোসাসহ সবজি খাওয়া ৪ বেশির ভাগ মানুষ জানে না কিন্তু সবজি খোসাসহ খাওয়ার উপকারিত। একটি সবজিতে থাকা মোট ফাইবারের ৩১ শতাংশ পর্যন্ত সবজির খোসায় পাওয়া যায়। আর এই ফাইবার দীর্ঘ সময়ের জন্য আমাদের সন্তুষ্টি রাখবে যা ক্ষুধা কমাতে বিশেষভাবে কার্যকর। এছাড়া সবজির খোসায় ফ্ল্যাভোনয়েড, অ্যান্টিঅপ্রিডেন্ট এবং অন্যন্য ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট থাকে যা ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, ইরেক্টাইল ডিসফাংশন এবং আর্থ্রাটিস প্রতিরোধ করে। চামড়াসহ খাওয়া যায় এমন সবজি বেগুন, মূলা, গাজর, মিষ্টিআলু, শসা, আলু ইত্যাদি। তবে খোসাসহ খেলে খুব ভালোভাবে চলমান পানিতে ধুয়ে নিবেন বিংবা নিরাপদ করে খাবেন। কেননা এতে ময়লা, জীবানু ও কীটনাশক থাকতে পারে যা শরীরে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যাসহ জটিলতা দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে কীটনাশক দূর করতে কিছু করতে কিছু উপায় আছে। গবেষনায় দেখা গেছে খাওয়ার আগে সবজিগুলো ৩০ মিনিট লবণ পানিতে রাখলে চামড়ায় কীটনাশক দূর হয় সহজে। এছাড়া বেকিং সোডা ২ চা চামচ ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখলে অতি সহজে কীটনাশক দূর হয়।

