নাটোর সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়িয়া এলাকায় দিন দিন বাড়ছে রোজেলা চাষ। স্থানীয়ভাবে এ উদ্ভিদকে বলা হয় ‘চুকা’। রোজেলা ফুলের পাঁপড়ি শুকিয়ে তৈরি হয় ‘চুক চা’ বা ‘রোজেলা চা’, যা এখন নাটোরের একটি সফল কৃষিপণ্যে পরিণত হয়েছে।কয়েক বছর ধরে কয়েকজন উদ্যমী কৃষক এ রোজেলা ফুল চাষ করে বাজারজাত করছেন। তাদের দাবি, এক বিঘা জমিতে রোজেলা চাষে খরচ বাদে লাভ হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। যা অন্যান্য ফসলের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।কৃষকরা এখন কিছুটা চিন্তিত। কারণ, সম্প্রতি ভারতীয় নিম্নমানের ও কমদামি রোজেলা ফুল দেশের বাজারে ঢুকছে। তবুও স্থানীয় রোজেলার চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে বলে জানান চাষিরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও রোজেলা চা পানকারীদের তথ্যমতে, টক স্বাদের রোজেলা চা ভিটামিন ‘সি’-সমৃদ্ধ। এটি কাশি উপশমে সহায়ক, শরীরের চর্বি নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং গ্যাসনাশক হিসেবেও কাজ করে। নিয়মিত রোজেলা চা পানে শরীর ও মন সতেজ থাকে।নানা উপকারিতার কারণে নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রোজেলা চায়ের কদর বেড়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যে রোজেলা চা এখন একটি বিকল্প পানীয় হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।ওষুধি গ্রামের প্রথম রোজেলা চাষি শহিদুল ইসলাম। তিনি জানান, ‘২০১৮ সালে প্রথম ৫ শতক জমিতে রোজেলা চাষ শুরু করি। চায়ের গুণাগুণ ও বাজারে চাহিদা দেখে তখনই বুঝেছিলাম, এটা লাভজনক হবে।’
প্রথম বছর ভালো লাভ হওয়ায় পরের বছর তিনি ৫ বিঘা জমিতে চাষ করেন। বর্তমানে তিনি নিজস্ব ৬ বিঘা এবং লিজ নেওয়া ৪ বিঘা জমিতে রোজেলা চাষ করছেন।শহিদুল বলেন, ‘জুন মাসে বীজ বপন করি, এরপর চারা তুলে জমিতে রোপণ করি। নভেম্বর মাসে ফুল ওঠে। তখন ফুল তুলে ড্রায়ার মেশিনে শুকিয়ে প্যাকেটজাত করি। খোলা ও প্যাকেট- দুভাবেই বিক্রি হয়।’
তিনি জানান, প্রতি বিঘায় খরচ হয় ৪০-৫০ হাজার টাকা। প্রতি বিঘা থেকে পাওয়া যায় ৭০-৮০ কেজি শুকনো ফুল-পাঁপড়ি। আগে পাইকারিতে বিক্রি হতো কেজিপ্রতি ৩ হাজার ২০০ টাকায়। এখন ভারতীয় নিম্নমানের পণ্য বাজারে আসায় দাম কমে ২ হাজার টাকায় নেমেছে। খুচরায় বিক্রি হয় ৩ হাজার টাকায়। তবুও খরচ বাদে তার বিঘাপ্রতি লাভ থাকে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা।শহিদুলের দেখাদেখি একই এলাকার কৃষক ইদ্রিস আলী, কোরবান আলী, রুবেল ও সাদেক আলী রোজেলা চাষ শুরু করেছেন। তাদের প্রত্যাশা, এ বছরও ভালো লাভ হবে। কৃষক ইদ্রিস আলী বলেন, ‘আগে ধান, সবজি করতাম। কিন্তু লাভ কম। রোজেলা চাষে ঝুঁকি কম, লাভ বেশি। তাই এখন পুরো পরিবার নিয়ে এ কাজ করছি।’
নাটোর প্রেস ক্লাব সভাপতি ফারাজী আহমেদ রফিক বাবন বলেন, ‘আমি নিয়মিত রোজেলা চা পান করি। আগে সাধারণ চা খেতাম, এখন পুরো পরিবার রোজেলা চায়েই অভ্যস্ত। এটা শুধু পানীয় নয়, ওষুধের মতো উপকার দেয়।’ তিনি জানান, রোজেলা চা বানাতে সামান্য পানিতে ৩-৬টি শুকনো ফুল দিতে হয়। ২-৩ মিনিট ফুটিয়ে নিলে রং ও ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর চিনি দিয়ে বা চিনিবিহীনভাবে পান করা যায়।নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘রোজেলা চাষে লাভজনক হওয়ায় দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে। এখন শুধু নাটোর নয়, অনলাইন ও অফলাইনে দেশের নানা জেলায় এটি বিক্রি হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রোজেলা চাষ কৃষকদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করছে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে তৈরি চা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। এর স্বাস্থ্যগুণও অসাধারণ।’

