সারা দেশে কয়েক দিন ধরে চলা লোডশেডিংয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। শনিবার রাজধানীর মহাখালীতে এক অনুষ্ঠানে দেশবাসীর কাছে দুঃখপ্রকাশ করে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বিরোধী দলকে ‘বিভ্রান্তির’ রাজনীতি বন্ধ করে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পনা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চারটি বিষয় উল্লেখ করে তাঁর উদ্দেশে ‘সমাধান-পরিকল্পনা’ দিয়েছেন সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। শনিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা প্রদানের জন্য ছয় মাসের আলটিমেটাম দিয়ে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন। আমরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম এবং সমাধান-পরিকল্পনা প্রস্তাব করছি।’
এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠে দোয়া-মোনাজাত ও দরিদ্রদের মধ্যে অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে গ্যাস-বিদ্যুতের সমাধান যদি বিরোধী দল দিতে পারে, সেগুলো সরকার গ্রহণ করবে। যদি না পারে, তাহলে বিভ্রান্তির রাজনীতির জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে তাদের।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিভ্রান্তি, হঠকারী রাজনীতি বাদ দেন। জনগণের উপকার হবে, সেই রকম পরিকল্পনা থাকলে উপস্থাপন করুন। রাস্তায় বসে ভাঙচুরের রাজনীতির দিন শেষ।’
চার দফা সমাধান-পরিকল্পনা হাসনাতের
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে হাসনাত আবদুল্লাহ তাঁর ফেসবুক পোস্টে চারটি বিষয় তুলে ধরেন।
এক. সমাধান ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়েছে
হাসনাত আবদুল্লাহ লেখেন, চ্যালেঞ্জ দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর জানা দরকার ছিল যে বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান ইতিমধ্যেই প্রস্তাব করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এনসিপির আহ্বায়ক, সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম স্বল্পমেয়াদি ৩০ দিন, মধ্যমেয়াদি ৬–১৮ মাস এবং দীর্ঘমেয়াদি সময়ের জন্য মোট ১৫ দফা সুনির্দিষ্ট সমাধান প্রস্তাব দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, তিনি নিজেও ধাপে ধাপে কোন সিদ্ধান্ত কোথায় ভুল হয়েছে, তা তুলে ধরেছেন। ভর্তুকি নীতি, ফুয়েল প্ল্যান, কন্টিনজেন্সি প্ল্যান ও ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান নিয়ে বিরোধীদলীয় সদস্যরা সমাধানধর্মী বক্তব্য দিয়েছেন। নাগরিক সমাজ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকেও মতামত এসেছে, যা জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এবং বিভিন্ন সেমিনারে আলোচিত হয়েছে।
হাসনাত বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বড় মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টা পরিষদ থাকা সত্ত্বেও এসব তথ্য তাঁর কাছে না পৌঁছানো ‘লজ্জার কথা’।
দুই. সরকারের টিমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
হাসনাত আবদুল্লাহ লেখেন, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী মিলিয়ে সরকারের সভাসদ ৬২ জন। তাঁদের কেউ নাগরিক মতামত বা বিরোধী দলের প্রস্তাবনা পড়ে দেখেননি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তাঁর ভাষ্য, এনসিপির দেওয়া ৩০ দিনের জন্য পাঁচটি, মধ্যমেয়াদি ৬–১৮ মাসের জন্য ছয়টি এবং দীর্ঘমেয়াদি চারটি সুনির্দিষ্ট সমাধান প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর পড়া উচিত।
বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে আলোচনা করতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিশেষ সংসদীয় অধিবেশন ডাকার অনুরোধেও সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
হাসনাত বলেন, সরকারের এমন ‘ইগ্নোরেন্সে’ তারা হতাশ এবং প্রধানমন্ত্রীর বড় টিমের সক্ষমতা, যোগ্যতা ও আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিন. প্রশাসনিক সক্ষমতা ও পরিকল্পনার ঘাটতির অভিযোগ
হাসনাত আবদুল্লাহর অভিযোগ, ছয় মাসে প্রশাসনে যে হারে দলীয় পদায়ন হয়েছে, তাতে ‘ইনস্টিটিউশনাল মেমরি’ বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। ফলে ফুয়েল প্ল্যান, কন্টিনজেন্সি প্ল্যান ও ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান নেই।
তিনি বলেন, ভর্তুকি কমানো হয়েছে যেখান থেকে বিদ্যুৎ আসে, অথচ ক্যাপাসিটি চার্জ অক্ষত রয়েছে। সচিবালয়ে আসা কর্মকর্তারা নতুন ও অনভিজ্ঞ এবং লবি গ্রুপের পরামর্শে চলছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
মহেশখালী এফএসআরইউতে আগুন লাগার পর রক্ষণাবেক্ষণে ত্রুটি ছিল কি না, সে বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, ঘটনাটি নাশকতা নাকি অবহেলা—সরকার নিজেই তা জানে না।
চার. মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি বাস্তবায়নের দাবি
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সরকার ডলার ও বকেয়ার কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কেনা যাচ্ছে না বলে জানাচ্ছে। এর ফলে দেশের অধিকাংশ ভারী শিল্প বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে বন্ধ হয়ে পড়েছিল।
তাঁর প্রশ্ন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনুমোদিত ‘মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি ২০২৫’ এখনো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না কেন।
হাসনাতের ভাষ্য, এই কাঠামোয় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সরাসরি বড় শিল্প ভোক্তার কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে। দুই পক্ষ দর নির্ধারণ করবে এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিষয়টি শুধু অবহিত থাকবে। উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়া যাবে।
তিনি বলেন, এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কোনো অর্থের প্রয়োজন হবে না। বাকি কাজ হিসেবে শুধু এসএলএ ফরম্যাট ও হুইলিং চার্জ চূড়ান্ত করতে হবে, যা কয়েক সপ্তাহের প্রশাসনিক কাজ।
‘ছয় মাসের হিসাব মেনে নিলাম’
হাসনাত আবদুল্লাহ তাঁর পোস্টে লেখেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি বলার আগেই আমরা সমাধান দিয়েছি। আপনারা সেটা পড়ার দরকার মনে করেননি কিংবা আপনার কাছে পৌঁছানো হয়নি। তথাপি, ছয় মাসের হিসাবটা আমরা মেনে নিলাম। কিন্তু ঘড়িটা বিরোধী দলের নয়, আপনার সরকারের।’
তিনি বলেন, মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি বাস্তবায়নে যদি ছয় মাসের বেশি সময় লাগে, তাহলে সেটি আর নীতির প্রশ্ন থাকবে না; বরং তা সরকারের সক্ষমতার ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি হবে।
‘আই হ্যাভ নো প্ল্যান’ বলেও মন্তব্য
পোস্টে হাসনাত আবদুল্লাহ আরও লিখেছেন, ‘পুনরাবৃত্তি করছি—প্রমাণিতভাবে ব্যর্থ মন্ত্রী ও অযোগ্য লোক দিয়ে কৌশলগত খাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বলে না। এটা হচ্ছে ‘আই হ্যাভ নো প্ল্যান’-এর টেস্টিং।’
তিনি আরও বলেন, একটি কার্যকর গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে আলটিমেটাম বা চ্যালেঞ্জ দেন না; বরং সরকারই তার কাজের জবাবদিহি করে।
হাসনাতের প্রশ্ন, সরকার ছয় মাস ক্ষমতায় থাকার পরও দেশ ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের মধ্যে কেন পড়ল এবং কেন রাষ্ট্র অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো।
পোস্টের শেষে তিনি লিখেছেন, ‘সবশেষে, সমাধান আমাদের হাতে আছে। কিন্তু ক্ষমতা আপনার হাতে। ছয় মাস পর জনগণ জানতে চাইবে, দুটোর মধ্যে কোনটির অভাবে দেশ অন্ধকারে ছিল।’


