জ্বালানি তেলের ওপর অতিরিক্ত কর প্রত্যাহারের দাবিতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে ‘ট্রেন মার্চ’ কর্মসূচি শুরু করেছে দেশটির অন্যতম প্রধান ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী (জেআই)। রোববার করাচি থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির নেতৃত্ব দিচ্ছেন দলটির আমির হাফিজ নাঈমুর রহমান।
‘ট্রেন মার্চ’ কর্মসূচি শুরুর আগে করাচির ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া এক বক্তৃতায় জামায়াতে ইসলামীর আমির হাফিজ নাঈমুর রহমান দেশটির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার হুমকিও দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সরকার যদি অনতিবিলম্বে এই বাড়তি কর বাতিল না করে, তাহলে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর এই আন্দোলন সরকার পতনের একদফা আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।
পাকিস্তানের জামায়াতের এই নেতা বলেন, তাঁদের সুনির্দিষ্ট কৌশল অনুযায়ী সারা দেশ থেকে সাধারণ মানুষ এখন ইসলামাবাদের উদ্দেশে পথ চলছে। ট্রেন মার্চের পাশাপাশি হাজার হাজার যানবাহন নিয়ে সড়কপথেও বড় বড় গাড়িবহর রাজধানীর দিকে এগোচ্ছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, দলের এই মোটরশোভাযাত্রা ও ট্রেনের বহর হায়দরাবাদ, লান্ধি, নওয়াবশাহ, রুহড়ি ও সুক্কুর হয়ে সামনে এগোবে। পথিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ শেষে রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছালে দলের নারী কর্মীদেরও রাজপথে নেমে আসার ডাক দেওয়া হবে।
ট্রেন মার্চের মূল উদ্দেশ্য তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, মূল্যস্ফীতিতে পিষ্ট সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়াই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার বদলে সরকার নিজেদের চরম অপশাসন ও ব্যর্থতার মাসুল সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। তাঁদের একটাই দাবি—জোরপূর্বক আদায় করা এই বাড়তি কর অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
তিনি বলেন, এটি তুলে নিলেই লিটারপ্রতি তেলের দাম এক ধাক্কায় কমে ২০০ রুপির কাছাকাছি চলে আসবে। আর তখনই কেবল ধুঁকতে থাকা দেশের অর্থনীতি ফের ঘুরে দাঁড়াবে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় পাকিস্তান সরকার জনগণের ওপর জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের বোঝা সবচেয়ে বেশি চাপিয়েছে জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির হাফিজ নাঈমুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক সংকটের দোহাই দিয়ে সরকার আসলে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ না ঝেড়ে সবাইকে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানান তিনি।
হাফিজ নাঈম বলেন, গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে জ্বালানির বাড়তি করের বিরুদ্ধে সারা দেশে লাগাতার গণআন্দোলন চলছে। বর্তমানে হায়দরাবাদ, সুক্কুর, মিরপুর খাস, লারকানা, নওশাহরো ফিরোজ, রাওয়ালপিন্ডি, গুজরাট এবং খাইবার পাখতুনখোয়ার ছোট-বড় বহু শহরে একযোগে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। কোনো ধরনের সরকারি বাধা বা রক্তচক্ষু দেখিয়ে এই জনস্রোত থামানো যাবে না বলে জানান তিনি।
ইসলামাবাদ অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকা জনতাকে দমন না করতে সরকারের প্রতি কড়া বার্তা দিয়ে জামায়াত প্রধান বলেন, তাঁরা চূড়ান্তভাবে ইসলামাবাদে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি শান্ত থাকবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না। সরকার যদি কোনোভাবে শক্তিপ্রয়োগ করে এই গণআন্দোলন নস্যাৎ করতে চায়, তাহলে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় জামায়াতে ইসলামী বলেছে, হাফিজ নাঈমের নেতৃত্বে করাচি থেকে শুরু হওয়া ‘ট্রেন মার্চ’ রোববার রাত ৮টায় সুক্কুরের রুহড়িতে পৌঁছে বড় গণসমাবেশে রূপ নেবে। এরপর সোমবার সকালে বিক্ষোভকারীরা পুনরায় মুলতানের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবেন।
জ্বালানি তেলের ওপর লিটারপ্রতি ১০০ রুপিরও বেশি চাপিয়ে দেওয়া বাড়তি কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবিতে কিছুদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে রাজপথে রয়েছে পাকিস্তানের এই রাজনৈতিক দল।
এর আগে শনিবার পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) জ্যেষ্ঠ নেতা রানা সানাউল্লাহ, আহসান ইকবাল ও সালমান রফিকের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের একটি সরকারি প্রতিনিধিদল লাহোরে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয় মনসুরায় গিয়ে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন।
দেশটির বর্তমান নিরাপত্তা হুমকির কথা তুলে ধরে ট্রেন মার্চ স্থগিত করার অনুরোধ জানিয়েছে পাকিস্তানের সরকার। তবে জামায়াত নেতা লিয়াকত বালুচ বলেন, জনগণের কাঁধ থেকে অন্যায্য কর না সরানো পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে। ফলে কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়াই বৈঠকটি ভেস্তে যায়। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও সরকার ও জামায়াতের আলোচনা থেকে সমঝোতা না হওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
গত ১৬ আগস্ট থেকে লাহোর, পেশোয়ার, করাচিসহ দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে টানা অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছে জামায়াত। পরবর্তীতে ৭ সেপ্টেম্বর থেকে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা বৈঠক শুরু হলেও তাতে কোনো সুরাহা মেলেনি।
এদিকে পাকিস্তানের কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তি এবং একাধিক দাবিতে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর রাজধানী ইসলামাবাদে পৃথকভাবে বড় ধরনের বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। সিনেটে বিরোধীদলীয় নেতা আল্লামা রাজা নাসির আব্বাস বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে পদযাত্রা পেছানোর অনুরোধ জানানো হলেও পিটিআই তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ২৭ সেপ্টেম্বরের পিটিআই কর্মসূচির প্রস্তুতির কথাও এসেছে।
ইসলামাবাদের প্রবেশপথে কন্টেইনার, হাসপাতালে ‘হাই অ্যালার্ট’
পরপর দুটি রাজনৈতিক দলের রাজধানী অভিমুখে লংমার্চ ঘিরে ইসলামাবাদে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে রাজধানীর প্রবেশ ও বের হওয়ার সব পয়েন্টে ব্যাপক নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে।
ইসলামাবাদের প্রধান সড়ক ও মোড়গুলোতে শত শত কন্টেইনার বসিয়ে পথ অবরুদ্ধ করে রেখেছে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইসলামাবাদের পুলিশ প্রধান সোহেল চৌধুরী এবং কমিশনার মোহাম্মদ ওসমান সরেজমিনে সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিদর্শন করেছেন।
নগর প্রশাসনের প্রধান কমিশনার বলেছেন, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখাই তাঁদের প্রধান অগ্রাধিকার। তবে সাধারণ নাগরিক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও সরকারি কর্মচারীদের দৈনন্দিন চলাচলে যেন অযথা বিঘ্ন না ঘটে, সেদিকে কড়া নজর রাখা হচ্ছে।
অন্যদিকে বড় ধরনের সংঘর্ষ বা হতাহতের আশঙ্কা থেকে ইসলামাবাদের প্রধান সরকারি হাসপাতাল পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (পিমস) এবং ফেডারেল গভর্নমেন্ট পলিক্লিনিক হাসপাতালে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
পিমস হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সব চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সার্বক্ষণিক কর্মস্থলে প্রস্তুত থাকতে হবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইসিইউ, ট্রমা সেন্টার, অপারেশন থিয়েটার, জরুরি বিভাগ, ব্লাড ব্যাংক ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা ২৪ ঘণ্টা সচল রাখার পাশাপাশি একযোগে বিপুলসংখ্যক রোগী সামলানোর জন্য পর্যাপ্ত বিকল্প প্রস্তুতি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: ডন।


