চলতি মৌসুমে হলুদ চাষে বিপুল সম্ভাবনা দেখছেন টাঙ্গাইলের কৃষকরা। জেলার পাহাড়ি অঞ্চলসহ ১২টি উপজেলায় প্রায় ৩,২০৮ হেক্টর জমিতে হলুদের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। কৃষকদের আশা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটলে প্রায় ৫৮ কোটি টাকার হলুদ বিক্রি সম্ভব হবে।
লাভজনক ও সহজ চাষ: কৃষকদের পছন্দের শীর্ষে হলুদ
হলুদ চাষে তুলনামূলক কম খরচ, কম ঝুঁকি এবং ভালো লাভ থাকায় এটি এখন কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
মধুপুর উপজেলার কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন,
“প্রতি বিঘায় ৩৫-৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে ৭০-৮০ মণ হলুদ উৎপাদন সম্ভব। বাজার ঠিক থাকলে ৭০-৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হয়।”
আরেক কৃষক বাপ্পি জানান,
“সার ও কীটনাশকের প্রয়োজন খুব কম। উৎপাদন ভালো হলে ৬০-৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হয়।”
মধুপুর, ঘাটাইল ও সখীপুরে সবচেয়ে বেশি আবাদ
টাঙ্গাইল জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে,
-
মধুপুরে আবাদ হয়েছে ৯৮০ হেক্টর জমিতে, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১২ হাজার টন।
-
ঘাটাইলে ১,৪৫৬ হেক্টর জমি,
-
সখীপুরে ৩৫০ হেক্টর,
— এ তিনটি উপজেলা সবচেয়ে বেশি হলুদ উৎপাদনে রয়েছে, যেখানে লাল দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি চাষের জন্য আদর্শ।
উন্নত জাতের হলুদে বাড়ছে ফলন
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় জাতের পাশাপাশি ডিমলা ও সিন্দুরী জাতের হলুদের চাষ দিন দিন বাড়ছে।
-
ডিমলা জাত স্থানীয় জাতের তুলনায় তিনগুণ বেশি ফলন দেয়
-
সিন্দুরী জাত দ্বিগুণ ফলন দিয়ে থাকে
এছাড়াও বারি হলুদ-৩, ৪ ও ৫ জাতগুলোও ভালো ফলন দিচ্ছে।
‘মিরাকল হার্ব’ হিসেবে পরিচিত হলুদ
হলুদের পুষ্টিগুণ ও ভেষজ গুণ নিয়েও কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
“হলুদে রয়েছে ফাইবার, ভিটামিন বি৬, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, কারকিউমিন ইত্যাদি, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, হজমে সাহায্য করে এবং ত্বক উজ্জ্বল করে।”
এছাড়া মসলা হিসেবে ব্যবহার ছাড়াও এটি প্রসাধনী ও রং শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
কৃষি বিভাগের সহায়তা
মধুপুর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা রকিব আল রানা বলেন,
“হলুদ একটি বছরব্যাপী ফসল হওয়ায় এটি সাথি ফসল হিসেবেও চাষ করা যায়। রোগবালাই কম হওয়ায় উৎপাদনের সম্ভাবনা বেশি।”
তিনি জানান, প্রতিটি ইউনিয়নে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ দুলাল উদ্দিন বলেন,
“হলুদে অন্তত ৪৬ রকমের ভেষজ গুণ রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।”
কৃষকদের আশাবাদ
অনেক কৃষক জানিয়েছেন, এ বছর বাজার ভালো থাকায় আগেই ব্যবসায়ীরা ফসল বুকিং দিয়ে রাখছেন।
সাজ্জাদ হোসেন, একজন তরুণ কৃষক বলেন,
“আমরা কয়েকজন মিলে একসঙ্গে হলুদ চাষ করছি। আগেই অর্ডার পাচ্ছি। এটা নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে।”
নারী কৃষক রাবেয়া খাতুন জানান,
“আগে শাকসবজি করতাম, লাভ কম হতো। এবার প্রথমবার হলুদ করেছি—ফলন আর বাজার দেখে খুশি হয়েছি।”
সারসংক্ষেপে:
-
আবাদকৃত জমি: ৩,২০৮ হেক্টর
-
সম্ভাব্য উৎপাদন: দশ হাজার টনের বেশি
-
সম্ভাব্য বাজার মূল্য: ৫৮ কোটি টাকা
-
অংশগ্রহণকারী উপজেলাসমূহ: ১২টি
-
চাষের শীর্ষ তিন উপজেলা: ঘাটাইল, মধুপুর, সখীপুর
বিশেষত্ব:
হলুদ চাষে উচ্চফলনশীল জাত, সরকারিভাবে কৃষি সহায়তা ও চাষযোগ্য জমির বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে টাঙ্গাইল এবার ফার্মিং-ভিত্তিক উদ্যোক্তা সাফল্যের মডেল হয়ে উঠছে।
প্রকাশকাল: ১৫ অক্টোবর ২০২৫
স্থান: টাঙ্গাইল

