বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, তাঁদের হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। গত দুই দিনে অনেক নাটক করা হয়েছে। তবে তাঁরা কোনো নাটকের পরোয়া করেন না। তিনি বলেন, ‘রাস্তায় নেমেছি জনগণের জন্য, প্রয়োজনে জীবন দেব, দাবি আদায় না করে ঘরে ফিরব না ইনশাআল্লাহ।’
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লং মার্চের বগুড়ার মাটিডালী বিমান মোড়ের পথসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা শুধু ডাক দিয়েছি, আসেন। আমরা ১৮ কোটি মানুষের অধিকার আদায় করতে চাই। অমনি আপনারা ঘর থেকে বের হয়ে আজকে বগুড়ার এই জায়গাটাকে জনসমুদ্রে পরিণত করেছেন। আপনাদের মোবারকবাদ।’
তিনি বলেন, ‘আমরা কেন এই লং মার্চের ডাক দিলাম? সরকারি দলের রাতের ঘুম হারাম। জায়গায় জায়গায় শুধু বলে, বিরোধী দল এত আগে লং মার্চ করছে কেন? আমরা জিজ্ঞেস করি, ক্ষমতায় বসার আগেই জনগণকে অপমান করলেন কেন?’
গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে শফিকুর রহমান বলেন, ‘৭০ ভাগ জনগণ গণভোটে হ্যাঁ বলে রায় দিল। আপনারাও সেই ভোট চেয়েছেন, আমরাও ভোট চেয়েছি। আমরা আমাদের জায়গায় আছি। আপনারা জায়গা পরিবর্তন করলেন কেন? আপনারা যদি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা না করতেন, আজকে আমাদের লং মার্চ করার প্রয়োজন হতো না।’
সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘সাত মাস চলে গেছে। সংসদের তিনটি অধিবেশন অতিক্রান্ত হলো। আপনারা জুলাই শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে সরকার গঠন করেছেন, আপনারা সনদ বাস্তবায়ন করেননি কেন? আপনারা বলেছিলেন, দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরবেন। আপনারা বলেছিলেন, এক কোটি মানুষকে চাকরি দেবেন। আপনারা এক কোটি মানুষের হাতে চাঁদাবাজির চাবি তুলে দিয়েছেন। দুর্নীতির রেট বাড়িয়ে দিয়েছেন।’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘বলেছিলেন গ্যাস দেবেন, বিদ্যুৎ দেবেন। এখন যিনি মহামান্য প্রেসিডেন্ট, তিনি তখন বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন মাঠে-ময়দানে। তাঁর স্লোগান ছিল—গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দে। এখন আমাদের স্লোগান হলো—গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দে। আমরা তো নতুন কোনো স্লোগান দিচ্ছি না। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যে স্লোগান দিয়েছিলেন, সেটাই আমরা বলছি। আপনারা দিচ্ছেন না বলেই আমাদের লং মার্চ।’
জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমাদের সন্তানদের চাকরির অধিকার আপনারা কেড়ে নিচ্ছেন। আমাদের সন্তানরা, আমরা মিলে যুদ্ধ করে, লড়াই করে ২৪-এ ফ্যাসিবাদকে বিদায় করে তাদের চাকরির অধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য জীবন দিয়েছে ১ হাজার ৪০০ সন্তান। আমরা কথা দিচ্ছি, আমাদের সন্তানদের জন্য প্রয়োজনে আরেকবার জীবন দিতে প্রস্তুত। তবু বৈষম্য আমরা বরদাশত করব না। জায়গায় জায়গায় প্রশাসক বসিয়ে মানুষকে শোষণ করছেন। আমরা বসে বসে আঙুল চুষব। এর জন্য আমাদের লং মার্চ।’
সার ও বিদ্যুৎ সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার কৃষক বন্ধু সার পায় না। ঠিক ১ হাজার ৪০০ টাকার সার তাকে ২ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়। বিদ্যুৎ দিতে পারে না। আবার ডাবল, ট্রিপল বিল আমাদের হাতে ধরিয়ে দেন।’
বিদ্যুৎমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই বগুড়ার পাশের জেলা হলো সিরাজগঞ্জ। তাই না? মন্ত্রী মহোদয়ের বাড়ি ওখানেই। উনি বলেন, আমাদের দেশে কোনো লোডশেডিং নেই, বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই, গ্রামে বিদ্যুতের তার একটু লম্বা, এ জন্য বিদ্যুৎ দেওয়া যায় না। লজ্জা! এ রকম একজন অপদার্থ মানুষকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে মন্ত্রী বানিয়ে রাখা হয়েছে। বেগম জিয়ার আমলে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, ব্যর্থ হওয়ার কারণে তাঁকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর সন্তান এসে তাঁকে প্রমোশন দিয়ে ফুল মন্ত্রী বানিয়েছে। যা হওয়ার তাই হচ্ছে, জাতির ১২টা বাজছে।’
আগামীর কর্মসূচি প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এবারের লং মার্চ হয়েছে ঢাকা থেকে রংপুরের দিকে। আগামীর লং মার্চ ইনশাআল্লাহ হবে পঞ্চগড় থেকে ঢাকার দিকে। আপনারা প্রস্তুত আছেন? এখন থেকে আপনারা প্রস্তুত থাকবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিরাজগঞ্জের জনসভায় আসছি, সবাই আমাকে এক আঙুল দেখায়। আমি বুঝি না যে আমাকে এক আঙুল দেখায় কেন। আমি গাড়ির জানালার গ্লাস নামালাম। গ্লাস নামানোর পরে বলে, দাদু, দাদু, এক দফা, এক দফা। এক দফা, সবাই বোঝেন তো? সেই এক দফার ডাক আসলে সবাই প্রস্তুত।’
আট দফার প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের আট দফা মানা হোক, আমরা এটা চাই। এই আট দফা কোনো দলের নয়, গোষ্ঠীর নয়, ব্যক্তির নয়। এই আট দফা বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের। এই আট দফা যদি মানা হয়, এক দফার দরকার নেই। যদি আট দফা মানা না হয়, তাহলে এক দফার জন্য প্রস্তুত থাকো। সেই এক দফার ডাক আমরা দিতে যদি বাধ্য হই, তাহলে ইনশাআল্লাহ একসঙ্গে লড়াই করে জনগণের বিজয়, ১৮ কোটি মানুষের বিজয় ছিনিয়ে আনব।’
নারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আজকে রাস্তায় আসতে আসতে দেখলাম, হাজার হাজার মা-বোন রাস্তায় নেমে আমাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। ২৪-এর আন্দোলনে মা-বোনেরা নেমেছিলেন। সেই আন্দোলন সফল হয়েছে।’
কুমিল্লার ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, ‘নাহিদ ইসলাম বললেন যে, দুই দিন নিখোঁজ থাকার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নাহিদা ম্যাডামের কলিজার টুকরা সন্তান, বয়স মাত্র ১৩ বছর, ক্লাস সেভেনের ছাত্র। বাবা একটা পোস্ট দিয়ে বলেছিলেন, সন্তানকে কোথায় খুঁজব, সমুদ্রে না জঙ্গলে? সন্তানের লাশ পাওয়া গেল। আমরা আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তা চাই।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার পিতার জন্মস্থানে দাঁড়িয়ে দাবি করছি, মেহেরবানি করে এই জাতির নিরাপত্তা দিন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব যাঁকে দিয়েছেন, তিনি সর্বমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু নিজের মন্ত্রণালয়ের কোনো খোঁজ রাখতে পারেন না। মেহেরবানি করে বাংলাদেশকে বাঁচতে দিন। আমরা জানি, আপনি পারবেন না। কারণ, সর্বাঙ্গে ব্যথা, আপনি মলম লাগাবেন কোথায়?’
এর আগে শনিবার সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে রংপুরের উদ্দেশে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লং মার্চ শুরু হয়। বিভিন্ন জেলায় পথসভা শেষে লং মার্চের বহর বগুড়ার মাটিডালী এলাকায় পৌঁছায়।
পথসভায় আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় নেতারা।
বগুড়া জেলা ও মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেলের সভাপতিত্বে এ পথসভা অনুষ্ঠিত হয়।


