বিজ্ঞাপন Walton Refrigerator Freezer Offer
পত্রিকার পাতা
ঢাকাসোমবার , ৯ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. উদ্যোক্তা
  5. কর্পোরেট
  6. কৃষি ও প্রকৃতি
  7. ক্যাম্পাস-ক্যারিয়ার
  8. খেলাধুলা
  9. চাকরির খবর
  10. জাতীয়
  11. তথ্যপ্রযুক্তি
  12. তারুণ্য
  13. ধর্ম
  14. পর্যটন
  15. প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সব খবর

বাঘায় ভেজাল কারখানায় অভিযান, ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল কারবারিরা

মুরাদুল ইসলাম সনেট
নভেম্বর ৭, ২০২৬ ১:২৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

বাঘায় ভেজাল কারখানায় অভিযান, ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল কারবারিরা

মুরাদুল ইসলাম সনেট, রাজশাহী :

রাজশাহীর বাঘায় বিদেশি নামি-দামি প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড নকল করে ভেজাল ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরির একটি কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিন ধরে একটি ভাড়া বাড়িতে গোপনে চলছিল এ অবৈধ কারবার। অভিযানে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের পণ্য জব্দ করে আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতে চার শ্রমিককে মোট এক লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়েছে।
তবে অভিযানের পরও কারখানার মূল মালিক ও নেপথ্যের ব্যক্তিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মাত্র ২০০ টাকা ফি দিয়ে নেওয়া ট্রেড লাইসেন্সের কাগজ ব্যবহার করে কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা, জরিমানার টাকা কে পরিশোধ করেছেন এবং অভিযানের সময় পুলিশের নাম ভাঙিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা রহস্য।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের চক বাউসা গ্রামে বাঘা-আড়ানী সড়কের পাশে বাঘা ফায়ার সার্ভিসের কাছেই একটি ভাড়া বাড়িতে চলছিল নকল ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরির কারখানা। বাইরে থেকে বাড়িটি তালাবদ্ধ থাকায় ভেতরে কী কর্মকাণ্ড চলত, তা বোঝার উপায় ছিল না। একই ইউনিয়নের হেদাতীপাড়া গ্রামের একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে তৈরি পণ্য বাজারজাত করার কার্যক্রমও পরিচালিত হতো।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যার পর স্থানীয় প্রশাসন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও পুলিশের সমন্বয়ে অভিযান চালিয়ে কারখানার বিপুল পরিমাণ পণ্য ও সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। পরে প্রায় দুই ট্রাক পণ্য ঘটনাস্থলেই আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়।
### অভিযানে যা পাওয়া গেল
বৃহস্পতিবার রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাঘা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুসরাত জাহান অনন্যার নেতৃত্বে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এতে রাজশাহী ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের জেলা তত্ত্বাবধায়ক মেহেদী আফজাল এবং বাঘা থানা-পুলিশের সদস্যরা অংশ নেন।
কারখানার তালা খুলে ভেতরে তৈরি করা বিভিন্ন পণ্য, ওষুধ তৈরির যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। সহকারী কমিশনার (ভূমি) জানান, জব্দ করা পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় দুই ট্রাক পণ্য ঘটনাস্থলেই পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
ঔষধ প্রশাসনের কর্মকর্তা মেহেদী আফজাল জানান, চক্রটি যুক্তরাজ্য, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে নকল ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরি করছিল। প্রতিটি প্যাকেটের দাম দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত।
কারখানায় পাওয়া ‘কারকুমা’ নামের একটি প্যাকেটের গায়ে ২ হাজার ১৭০ টাকা, কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা একটি পণ্যে ২ হাজার ৩৯৯ টাকা এবং মালয়েশিয়ার নাম ব্যবহার করা আরেকটি পণ্যে ২ হাজার ২৯০ টাকা মূল্য লেখা ছিল।
এসব পণ্য মূলত অনলাইনে বিক্রি করা হতো। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা প্যাকেটও অভিযানে জব্দ করা হয়েছে। কর্মকর্তা মেহেদী আফজাল জানান, বিষয়টি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত হওয়ায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এ বিষয়ে সরাসরি মামলা করতে পারে না।
এদিকে অতিরিক্ত ওজনের কারণে ট্যাবলেট তৈরির একটি যন্ত্র সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাই সেটি অকেজো করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
### বুধবারের অভিযান, গ্রেপ্তার দুইজন ও এক লাখ টাকা জরিমানার রহস্য
এর আগে বুধবার (৪ নভেম্বর) সন্ধ্যায় ঢাকার বনানী থানার পুলিশের একটি দল স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় ওই কারখানায় অভিযান চালায়। এ সময় সাতজনকে আটক করা হয়। বনানী থানার পুলিশ ‘কারকুমা’ নামের একটি পণ্যের অভিযোগের সূত্র ধরে সেখানে যায়। কারখানায় পাওয়া ওই পণ্যের সব প্যাকেট জব্দ করে নিয়ে যায় তারা। এ ঘটনায় অভিযুক্ত দুজনকে নিজেদের হেফাজতে নেয় বনানী থানা-পুলিশ।
যোগাযোগ করা হলে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালাউদ্দিন বলেন, জুলাই মাসের একটি মামলায় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বাঘায় অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেখানে নকল ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরির একটি কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। মামলার অন্যান্য আলামতও সেখান থেকে জব্দ করা হয়েছে।
তবে আটক দুজনের নাম জানাতে পারেননি স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের একজনের নাম মজিবর এবং অন্যজন সুমন। তাঁদের বাড়ি নাটোর এলাকায় বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, বাকি নয়জনের মধ্যে পাঁচজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। অপর চারজনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মোট এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৪১ ধারায় এ জরিমানা করা হয়।
জরিমানার রশিদে স্বাক্ষর করেন চারঘাট উপজেলার ভায়ালক্ষ্মীপুর গ্রামের আবু সৈয়দ হোসেনের ছেলে খালিদ হাসান। সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার লক্ষ্মীকুল গ্রামের শ্রমিক দিলু মিয়া ও হাসমত।
কারখানার মূল মালিককে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানান ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুসরাত জাহান অনন্যা।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জরিমানার এক লাখ টাকা কে পরিশোধ করেছেন, তা নিয়ে। কার পকেট থেকে এই টাকা দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কেউ স্পষ্ট তথ্য দেননি।
কারখানার অন্য শ্রমিকদের মধ্যে শাহাপরান, হৃদয়, সাইফুল, শাহাজালাল, মিলন ও শফিকুলের নাম জানা গেছে। তাঁদের সবার বাড়ি নাটোর এলাকায় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
### পুলিশের নাম ভাঙিয়ে ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারেন। এমনকি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান ঘিরে ঘটনা আড়াল করে পুলিশসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জানান, পুলিশের নাম ভাঙিয়ে বুধবার রাতে ৫০ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। অভিযোগকারীর পরিচয় জানা গেলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে এ-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে বাঘা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেরাজুল হক বলেন, পুলিশের নাম ভাঙিয়ে টাকা নেওয়ার বিষয়টি তিনি শুনেছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। তবে কোনো পুলিশ সদস্য এ অর্থ নেওয়ার সঙ্গে জড়িত নন বলে তিনি দাবি করেন। এ ঘটনায় কেউ ভুক্তভোগী হলে মামলা করতে চাইলে পুলিশ মামলা নেবে।
### তালাবদ্ধ বাড়ির ভেতরে ছিল উৎপাদন ও শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাড়িটি বাইরে থেকে সব সময় তালাবদ্ধ দেখা যেত। ফলে ভেতরে কী ধরনের কর্মকাণ্ড চলত, তা তাঁরা বুঝতে পারেননি। ধারণা করা হচ্ছে, বাড়ির পেছনের একটি দরজা দিয়ে লোকজন যাতায়াত করতেন।
অভিযানের সময় বাড়ির ভেতরে শোয়ার খাট, খাবারের থালাবাসন এবং পানির নলকূপসহ বিভিন্ন জিনিস পাওয়া যায়। এতে ধারণা করা হচ্ছে, পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থাও ছিল ওই বাড়িতে।
### বাড়ি ভাড়া নিয়ে অবৈধ কারবার, মালিক লাপাত্তা
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাড়ির মালিক হায়দার আলী চাকরির সুবাদে ঢাকায় থাকেন। তাঁর ভাই শামীম ও মা রিনা বেগম জানান, প্রায় ছয় মাস আগে নাটোর এলাকার রেজাউল করিম মাসিক আট হাজার টাকা ভাড়ায় বাড়িটি নেন।
বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় রেজাউল করিম ‘নাটোর ভেষজ মার্ট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের ফটোকপি জমা দিয়েছিলেন। তবে ওই ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ৫ মে পর্যন্ত।
ট্রেড লাইসেন্সের তথ্য অনুযায়ী, রেজাউল করিমের বাড়ি নাটোর সদর উপজেলার ৪ নম্বর লক্ষ্মীপুর-খোসাবাড়িয়া ইউনিয়নের খোসাবাড়িয়া গ্রামে। লাইসেন্সে দেওয়া মোবাইল নম্বরটি বন্ধ থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
মাত্র ২০০ টাকা ট্রেড লাইসেন্স ফি দিয়ে নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের কাগজ ব্যবহার করে কীভাবে কোটি কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা পরিচালিত হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া একই উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের হেদাতীপাড়া গ্রামে বাজারজাতকরণের উদ্দেশ্যে আরেকটি বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। বাড়ির মালিক রেজাউলের বোন রোজিনা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, তাঁর ভাই ঢাকায় থাকেন। তবে বাড়ি ভাড়ার কোনো লিখিত চুক্তি নেই। ভাড়ার টাকা বিকাশের মাধ্যমে পরিশোধ করা হতো।
### অভিযানের পরও রয়ে গেছে নানা প্রশ্ন
দুই কোটি টাকা মূল্যের নকল পণ্য, এক লাখ টাকা জরিমানা, মূল কারবারিদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এবং পুলিশের নাম ভাঙিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ—সব মিলিয়ে বাঘার এই অভিযান ঘিরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
শুধু শ্রমিকদের আটক, জরিমানা এবং পণ্য পুড়িয়ে ধ্বংস করলেই কি এই অবৈধ ব্যবসা বন্ধ হবে? কোটি টাকার ব্যবসার নেপথ্যে থাকা মূল ব্যক্তিরা কারা? কারা এই কারখানায় অর্থ বিনিয়োগ করেছেন? মেয়াদোত্তীর্ণ ট্রেড লাইসেন্সের কাগজ দিয়ে কীভাবে দীর্ঘদিন এমন ব্যবসা পরিচালিত হলো? জরিমানার এক লাখ টাকা কে পরিশোধ করলেন? পুলিশের নাম ভাঙিয়ে ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগেরই বা কী তদন্ত হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে এ ধরনের অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর পেছনে থাকা মূল হোতা, অর্থের জোগানদাতা এবং বাজারজাতকরণ চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি অনলাইনে বিক্রি হওয়া এসব পণ্য কারা কিনেছেন এবং কোথায় কোথায় সরবরাহ করা হয়েছে, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
নইলে ভেজাল পণ্যের এই চক্র আবারও নতুন নামে ও নতুন ঠিকানায় তাদের অবৈধ ব্যবসা শুরু করতে পারে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।