দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত এ আদেশ দেন।
এদিন দুপুর ২টা ২০ মিনিটে গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকসুদা ইসলামকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে আনা হয়। তাঁদের সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামসুজ্জোহা সরকার প্রত্যেকের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।
পরে কড়া পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে বেলা ৩টা ১১ মিনিটে তাঁদের এজলাসে তোলা হয়। এ সময় গাজী নজরুল তাঁর পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং মামলার এজাহার পড়ে দেখেন। বেলা ৩টা ১৪ মিনিটে বিচারক এজলাসে আসেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান আদালতের অনুমতি নিয়ে ওকালতনামায় স্বাক্ষর করান।
এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আসামিদের রিমান্ডে নেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি আদালতকে বলেন, ঘটনার সময় তাঁরা একই বাসায় অবস্থান করছিলেন। ভিকটিমের আত্মহত্যায় তাঁদের কোনো প্রভাব ছিল কি না, তা উদঘাটনসহ আত্মহত্যায় প্ররোচনা, উসকানি, মানসিক চাপ, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা অন্য কোনোভাবে আত্মহত্যায় সহায়তা করেছেন কি না, এসব তথ্য জানতে তাঁদের রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন।
শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী আদালতকে বলেন, গাজী নজরুল চারবারের সংসদ সদস্য এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি হৃদরোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত এবং এসব অসুস্থতার চিকিৎসা নিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে দেশের কোনো থানায় তাঁকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পরিবেশ নেই। তাঁকে রিমান্ডে নেওয়ার কোনো যুক্তিসংগত কারণও নেই।
এ সময় জামিনের আবেদন করে আইনজীবী বলেন, ‘উনি পালিয়ে যাওয়ার লোক নন। যেহেতু একটা ঘটনা ঘটেছে, এ বিষয়ে পুলিশ বিস্তর তদন্ত করতে পারে। তদন্ত সংস্থাকে যেকোনো সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছেন তিনি।’ এ পর্যায়ে রিমান্ড বাতিল করে গাজী নজরুলের জামিন দেওয়ার আবেদন করেন তিনি।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী আসামিদের রিমান্ডে নেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নিহতের বাবা পেশায় মুদি দোকানি। তাঁর বয়স ৪০ বছর এবং নিহতের বয়স ১৯ বছর। নিহতের মামা এই আসামির গাড়িচালক ছিলেন। তাঁর মাধ্যমে নিহতের সঙ্গে আসামির পরিচয় হয়। এরপর বিভিন্ন কলাকৌশল ও প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে স্ত্রী হতে বাধ্য করা হয়। প্রথম স্ত্রীকে বিষয়টি গোপন রেখে বিভিন্ন হোটেল-মোটেলে যাতায়াত করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় একটি মামলাও হয়।
তিনি বলেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় বেশ কিছু সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে। সেখানে নিহতের মৃত্যুর কারণ উল্লেখ আছে। এটি আত্মহত্যা নাকি হত্যা, তা এখনো পরিষ্কার নয়। হত্যার বিষয়টিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নিহতের সঙ্গে পরিচয়ের পর বিয়েতে বাধ্য করার পরিকল্পনা এবং তাঁকে ন্যাম ভবনে নিয়ে আসা—সবকিছুতেই একটি পরিকল্পনা ছিল। আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এসব তথ্য উঠে আসবে।
শুনানিতে তিনি আরও বলেন, আসামিরা জামায়াতে ইসলামীর সদস্য। গাজী নজরুল জামায়াতের এমপি। তাঁরা নাকি সৎ লোকের শাসন কায়েম করতে চান। এ সময় বিচারক তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের কথা না বলে মামলার বিষয়বস্তু নিয়ে বলতে। পরে প্রসিকিউটর ফারুকী নিহতের মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে আসামিদের রিমান্ড চান।
এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, মামলার এজাহার ও ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী এটি যে আত্মহত্যা, তা স্পষ্ট। আসামিদের অসুস্থতা ও বয়স বিবেচনায় নিয়ে তিনি জামিনের আবেদন করেন।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে বিচারক রিমান্ডের আদেশ দিয়ে এজলাস ত্যাগ করেন। পরে ৩টা ৩৩ মিনিটে আবার বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে তাঁদের কাঠগড়া থেকে আদালতের হাজতখানায় নিয়ে যায় পুলিশ। এ সময় উপস্থিত আইনজীবীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন।
যে ৫ কারণে রিমান্ড চাওয়া হয়
১. ভিকটিম মরিয়ম ফাঁস লাগিয়ে মৃত্যুবরণ করার সময় এজাহারনামীয় আসামিরা একই বাসায় ছিলেন। তাই তাঁর আত্মহত্যায় তাঁদের কোনো প্রভাব ছিল কি না, তা উদঘাটন।
২. ভিকটিমকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা, উসকানি, মানসিক চাপ, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা অন্য কোনোভাবে আত্মহত্যায় সহায়তার ক্ষেত্রে আসামিদের ভূমিকা উদঘাটন।
৩. ভিকটিম মরিয়মের আত্মহত্যায় এজাহারনামীয় পলাতক আসামি ওবায়দুর রহমানের ভূমিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার।
৪. ভিকটিম মরিয়মের আত্মহত্যায় অজ্ঞাতনামা কোনো আসামি জড়িত আছেন কি না, তা শনাক্ত করে গ্রেপ্তার।
৫. মামলার মূল রহস্য উদঘাটন।
যেভাবে মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার
এর আগে গতকাল রোববার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় মরিয়ম খাতুনের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেন। মামলায় এমপি গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম এবং শ্যালক ওবায়দুর রহমান—এই তিনজনকে আসামি করা হয়।
উল্লেখ্য, গত জুলাইয়ে মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁকে ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
এর পর ২২ জুলাই সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সাংগঠনিক তদন্তে তাঁর নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় দলটির গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাঁকে বহিষ্কার করা হয় এবং একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি জানানো হয়।
এদিকে, ভিডিও ভাইরালের পর অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ এবং ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে গত ২১ জুলাই গাড়িচালক ও মৃত মরিয়ম খাতুনের মামা ওবায়দুর রহমান বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় হাইকোর্ট থেকে গত ১০ আগস্ট আট সপ্তাহের জামিন পান গাজী নজরুল ইসলাম। সেই মামলার বাদী ওবায়দুরকে এবার মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় আসামি করা হয়েছে।
মামলায় বাদী উল্লেখ করেন, গত জুনে গাজী নজরুলের সঙ্গে ভিকটিমের ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী বিয়ে হয়। তিনি সংসদ সদস্য হওয়ায় ভিকটিম মরিয়ম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামসহ শেরেবাংলা নগর থানাধীন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকায় সংসদ ভবনের বিপরীতে ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলায় বসবাস করতেন। আসামি ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় গাজী নজরুলের সঙ্গে ভিকটিম মরিয়মের বিয়ে হয়।
বিয়ের পর থেকেই নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভিকটিম মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে বিভিন্ন সময়ে মোবাইল ফোনে তাঁর পরিবারকে জানাতেন তিনি। এর ধারাবাহিকতায় ২০ সেপ্টেম্বর বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৫টায় গাজী নজরুল ভিকটিমের বাবাকে মোবাইল ফোনে দ্রুত তাঁদের বাসায় যেতে বলেন। বাসায় এসে তিনি দেখতে পান, সেখানে অনেক লোকজন উপস্থিত।
তখন তিনি জানতে পারেন, বাসার ভেতরের একটি কক্ষে ভিকটিম মরিয়ম ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে আছেন। শেরেবাংলা নগর পুলিশের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে মেয়ের মরদেহ ফ্যানের সঙ্গে ওড়না দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তিনি। এ সময় বিছানার ওপর তাঁর লেখা একটি সুইসাইড নোট পাওয়া যায়।
আসামিদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এবং তাঁদের প্ররোচনায় তাঁর মেয়ে মরিয়ম আত্মহত্যা করেছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।


