জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং যুবলীগ-ছাত্রলীগের চার শীর্ষ নেতাসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে পাঁচজনের ৫০ শতাংশ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সরকারি অনুকূলে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত সম্পদ থেকে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর সোয়া ১২টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রায় পড়ার শুরুতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, প্রসিকিউশন, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান বিচারপতি নজরুল ইসলাম। তিনি জানান, মামলার প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের পরিমাণ ছিল ২৫ কেজি। আসামিরা উপস্থিত থাকলে পুরো রায় পড়া যেত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এরপর চার অভিযোগে কে কী দণ্ড পেয়েছেন, তা ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অপর ছয়জন হলেন—আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।
এর মধ্যে ওবায়দুল কাদেরকে ১ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড, ২ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড, ৩ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড এবং ৪ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বাহাউদ্দিন নাছিমকে ১ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। ২ নম্বর অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়। ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগ একত্রে বিবেচনায় নিয়ে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
মোহাম্মদ আলী আরাফাতকে ১ ও ৪ নম্বর অভিযোগ একত্রে বিবেচনায় নিয়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। ২ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ৩ নম্বর অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
পরশকে ১ নম্বর অভিযোগ থেকে খালাস দেন ট্রাইব্যুনাল। ২ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড, ৩ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং ৪ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
নিখিলকে ১ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২, ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে পৃথক ধারায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সাদ্দামকে ১ ও ২ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে পৃথকভাবে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগ একত্রে বিবেচনায় নিয়ে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
ইনানকে ১ ও ২ নম্বর অভিযোগে পৃথকভাবে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগ একত্রে বিবেচনায় নিয়ে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত।
এ ছাড়া ওবায়দুল কাদের, নাছিম, আরাফাত, পরশ ও নিখিলের সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রির অর্থ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে নিহত ও আহত ব্যক্তি বা তাঁদের পরিবারকে জুলাই ফাউন্ডেশন অথবা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, আবদুস সোবহান তরফদার, জহিরুল আমিন, মঈনুল করিমসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া এ মামলায় সাক্ষ্য দেওয়া কয়েকজন সাক্ষীও উপস্থিত ছিলেন।
প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমনে সমন্বিতভাবে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। নেতাকর্মীদের রাজপথে নামিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আহ্বান জানানোসহ একাধিক বৈঠকে সহিংসতার পরিকল্পনা করেন। কোথাও কোথাও সশস্ত্র হামলা, কঠোর দমন-পীড়ন ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন। তাঁদের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দেশজুড়ে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ব্যাপক সহিংসতা সংঘটিত হয় বলে উল্লেখ করা হয়।


