সরকারি আদেশ অমান্য করে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগ না দেওয়া এবং ‘পলায়ন’-এর অভিযোগে বাংলাদেশ পুলিশ ক্যাডারের ছয়জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করেছে সরকার।
মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের শৃঙ্খলা-১ শাখা থেকে জারি করা পৃথক ছয়টি প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির অনুমোদন এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) পরামর্শক্রমে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধান অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারা হলেন—ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার (বর্তমানে পুলিশ সুপার) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন, ডিএমপির সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার কাজী আশরাফুল আজীম, সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (অতিরিক্ত ডিআইজি) সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজন কুমার দাস এবং সহকারী পুলিশ কমিশনার (পিপিএম) মো. গোলাম রুহানী।
মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে উদ্দেশ করে কথিত ‘স্যার, একটা গুলি করলে একটাই মরে’ মন্তব্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন। গোলাম রুহানী ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানীর ছোট ভাই।
কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (অ্যাডমিন অ্যান্ড গোয়েন্দা-দক্ষিণ) বিপ্লব কুমার সরকার বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত থাকা অবস্থায় ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে কোনো লিখিত বা মৌখিক অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। তদন্তে তার বিরুদ্ধে ‘পলায়ন’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ওই তারিখ থেকেই তার বরখাস্ত কার্যকর করা হয়েছে।
সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (অতিরিক্ত ডিআইজি) সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বরিশাল রেঞ্জে সংযুক্ত থাকা অবস্থায় ২২ আগস্ট ২০২৪ থেকে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। একাধিক নোটিশ দিয়েও তাকে কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকেও একই তারিখ থেকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
ডিএমপির উত্তরা বিভাগের সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার কাজী আশরাফুল আজীমকে চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে বদলি করা হলেও তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। ১৪ আগস্ট ২০২৪ থেকে অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিত থাকার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’ ও ‘পলায়ন’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ওই তারিখ থেকেই তার বরখাস্তের আদেশ কার্যকর করা হয়েছে।
ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার এবং পরে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন ২৮ আগস্ট ২০২৪ থেকে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। তদন্তে তার বিরুদ্ধেও ‘পলায়ন’ ও ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজন কুমার দাস কক্সবাজারের ৮ এপিবিএনে কর্মরত ছিলেন। পাঁচ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি শেষে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ তার কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি আর ফিরে আসেননি। টানা ৬০ দিনের বেশি অননুমোদিত অনুপস্থিত থাকার ঘটনায় তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে ‘পলায়ন’ ও ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ওই তারিখ থেকেই তার চাকরিচ্যুতি কার্যকর করা হয়েছে।
সহকারী পুলিশ কমিশনার (পিপিএম) মো. গোলাম রুহানী ডিএমপি থেকে খাগড়াছড়ির এপিবিএনে বদলি হওয়ার পর ১১ আগস্ট ২০২৪ থেকে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। তদন্ত এবং বিপিএসসির পরামর্শের ভিত্তিতে ১১ আগস্ট ২০২৪ থেকে কার্যকর করে তাকেও চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
তদন্ত শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী প্রত্যেক কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও দেওয়া হয়।
অভিযোগ তদন্তের জন্য পৃথক তদন্তকারী কর্মকর্তাও নিয়োগ করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউই অভিযোগের জবাবে লিখিত ব্যাখ্যা দাখিল করেননি।
পরবর্তীতে নিরপেক্ষ তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে ‘পলায়ন’ ও ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এরপর বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) পরামর্শ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮–এর ৪(৩)(১)(ঘ) বিধি অনুযায়ী তাদের চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

