মনোয়ারা বেগম এক ছাগল দিয়ে খামার শুরু করেন। এখন রয়েছে ছাগল, গরু, হাঁস, মুরগি ও কবুতরের খামার। মাসে আয় করেন হাজার হাজার টাকা। সংসারে ফিরেছে সচ্ছলতা। পাশে আছেন ছেলে ও ছেলের বউ। পরিশ্রম আর ধৈর্যেই তিনি হয়েছেন গ্রামের সফল নারী।
ভোলা সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের শাজাহান তালুকদারের বাড়ির গৃহবধূ মনোয়ারা বেগম। স্বামীর অল্প আয়ে চলছিল না সংসার। তিন ছেলে, এক মেয়ে আর স্বামীকে নিয়ে দিন জীবিকানির্বাহ করছিলেন তিনি। কষ্টের সংসারে মেয়ের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল সবসময়। তখন থেকেই নিজের আয়ে কিছু করতে চাইলেন।
প্রায় ১৫ বছর আগে ভাই আক্তার হোসেনের কাছ থেকে একটি ছাগল কিনে আনেন। তখন মনেও ছিল না- এই একটি ছাগলই একদিন তার জীবনের চিত্র বদলে দেবে। কিছুদিনের মধ্যে ছাগলটি দুটি বাচ্চা দেয়। বাচ্চাগুলো বড় হলে বিক্রি করেন। এরপর আবার বাচ্চা, আবার বিক্রি। এভাবে ছাগল বিক্রির টাকায় মেয়ের বিয়েও দেন।
ছাগল পালনে আগ্রহ বাড়তেই ছোট ছোট আয়ের জমানো টাকায় গড়েন একটি ছোট খামার। ৮-৯ বছর আগে বড় ছেলে সুমনের বিয়ে দেওয়ার পর ছেলের বউ সালমা বেগম পরামর্শ দেন, ‘বাচ্চা বিক্রি না করে বাড়ালে খামার বড় হবে, আয়ও বাড়বে।’ তখন প্রায় দুই বছর বাচ্চা বিক্রি বন্ধ রাখেন মনোয়ারা। খামারে ছাগলের সংখ্যা একসময় দাঁড়ায় ১০-১৫টি। তখন থেকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাকে।
মনোয়ারা বেগম এখন শুধু ছাগল নয়, গরু, হাঁস, মুরগি, কবুতরও পালন করেন। সবখানেই আয় বাড়ছে। বর্তমানে তার খামারে ৯টি ছাগল আছে। প্রতি ছয় মাসে ছাগল বিক্রি করে আয় হয় ৫০-৯০ হাজার টাকা। সেই টাকায় একটি গরু কেনেন। এখন গরুর সংখ্যা চারটি। গরু বিক্রি করে গত দুই বছরে আয় করেছেন প্রায় ১ লাখ টাকা। হাঁস-মুরগি ও কবুতরের খামার থেকেও গত এক বছরে আয় হয়েছে প্রায় ৯০ হাজার টাকা।
তার এই কাজে সবচেয়ে বড় সহযোগী ছেলের বউ সালমা বেগম। খামারের কাজে শাশুড়িকে সব সময় সহযোগিতা করেন তিনি। সালমা বলেন, ‘বিয়ের পর এসে দেখি শাশুড়ি ছাগল পালন করছেন। তখন তাকে বলি, খামারটা বড় করলে আয়ও বাড়বে। তারপর থেকে আমরা একসঙ্গে কাজ করি। এখন আর এটা আমাদের কাছে কষ্টের কাজ মনে হয় না।’
ছোট ছেলে নাঈম বলেন, ‘আমি ডিগ্রি ক্লাসে পড়ি। পড়াশোনার ফাঁকে বিলে গিয়ে ঘাস কেটে আনি। মা আর ভাবি সেই ঘাস ছাগল-গরুকে খাওয়ান। মা খুব কষ্ট করেন। তার পরিশ্রমেই আমাদের ভাগ্য বদলেছে।’
মনোয়ারা বেগমের বয়স ৫০ পেরোলেও তার উদ্যমে ক্লান্তি নেই। ছাগলগুলোকে ঘাস খাওয়ানোর সময় খামারে গিয়েই দেখা যায় তাকে। সঙ্গে ছিলেন ছেলের বউ সালমা। দুজনের মুখে হাসি। মনোয়ারা বলেন, ‘পরিশ্রম করলে সফল হওয়া কঠিন কিছু না। ছাগল দিয়েই শুরু করেছি, আজ হাঁস-মুরগি-গরুও আছে।’
ভোলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সলাম খান বলেন, ‘মনোয়ারা বেগমের মতো অনেক নারী গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি ও কবুতরের খামারে সফল হচ্ছেন। আমরা তাদের নিয়মিত পরামর্শ ও পশু চিকিৎসাসেবা দিচ্ছি। এখন নারীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে আসছেন।’
মনোয়ারা বেগম এখন তুলাতুলি গ্রামের সফল নারী উদ্যোক্তাদের একজন। তার পরিশ্রম, ধৈর্য আর সাহস বদলে দিয়েছে নিজের পরিবার ও চারপাশের মানুষদের ভাবনার ধরন।

