নিজের ওপর ছিল অটুট বিশ্বাস। ছিল কঠোর পরিশ্রমের প্রতিজ্ঞা। সেই বিশ্বাস আর পরিশ্রমেই সফলতার গল্প গড়েছেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মুঈদ আশিক চিশতী। পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী। তবে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখতে গড়ে তুলেছেন একটি আধুনিক গরু ও মহিষের খামার। সেখান থেকেই শুরু তার উদ্যোক্তা জীবনের নতুন অধ্যায়। আজ তিনি প্রতিবছর আয় করছেন লাখ লাখ টাকা।এই সাফল্য শুধু আর্থিক লাভে সীমাবদ্ধ নয়। তার খামার আশপাশের অনেক তরুণের জীবনের দিশা বদলে দিয়েছে। তার অনুপ্রেরণায় বহু যুবক আত্মকর্মসংস্থানে এগিয়ে এসেছে। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠেছেন একজন রোল মডেল উদ্যোক্তা।
২০০৭ সালে তিনি স্বল্প পরিসরে কয়েকটি গরু ও মুরগি দিয়ে খামারের যাত্রা শুরু করেন। তখন সেটি ছিল একেবারেই ছোট উদ্যোগ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ছোট খামার আজ রূপ নিয়েছে একটি বড় কৃষি প্রতিষ্ঠানে। শুরুতে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। কখনো পুঁজি সংকট। কখনো অভিজ্ঞতার অভাব। তবে অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর ধৈর্য তাকে থামতে দেয়নি।খামার পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় তিনি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেন। সঠিক পরিকল্পনা নেন। স্থানীয় কৃষি ও পশুপালন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেন। ধাপে ধাপে খামার সম্প্রসারণ করেন। বর্তমানে তার মূল খামারটি সাড়ে ৭ বিঘা জমিতে বিস্তৃত। পাশাপাশি ৫০ বিঘা জমিতে সাইলেজ উৎপাদন করছেন। এ ছাড়া ৪০ বিঘা জমিতে ৮টি পুকুরে চলছে মৎস্য চাষ। তার প্রতিষ্ঠান এখন বছরে আয় করছে লাখ লাখ টাকা।
খামারে বর্তমানে রয়েছে শতাধিক গরু ও মহিষ। এখানে বিশেষভাবে লালন করা হচ্ছে বিদেশি জাতের মুররা, এলবিনো ও নিলিরাভি মহিষ। পাশাপাশি রয়েছে আরসিসি, মিরকাদিম ও ফিজিয়ান জাতের গরু। এসব পশুর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটি মানসম্মত পশুপালন ব্যবস্থা। খাদ্য ব্যবস্থাপনায় তিনি নিজেই উৎপাদিত সাইলেজ ব্যবহার করেন। এতে খামারের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।এই খামার এলাকার মানুষের জীবিকা নির্বাহের উৎস হয়ে উঠেছে। আশপাশের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নেও খামারটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অল্পদিনের বাণিজ্যিক সম্ভাবনায় বিনিয়োগ বেড়েছে। খামারে প্রতিদিন কাজ করছেন ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক। তারা দৈনিক মজুরি ও মাসিক বেতনে কাজ করেন। শ্রমিকরা জানান, নিয়মিত বেতন, ভালো কাজের পরিবেশ ও মালিকের মানবিক আচরণে তারা সন্তুষ্ট। এই খামারের আয় দিয়েই তাদের সংসার চলে।
মুঈদ আশিক চিশতী বলেন, ‘প্রথমে অনেকে আমার পরিকল্পনাকে অবিশ্বাস করেছিল। তবে আমি নিজের ওপর বিশ্বাস রেখেছি। আজ আমার খামার শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, সামাজিকভাবেও একটি মডেল।’ তিনি আরও জানান, এই খামার তার নিজের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি এলাকার বহু বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। খামারে কাজ করে তারাও স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।তবে পথটা সহজ ছিল না। চিশতী জানান, খামার পরিচালনার শুরুতে তাকে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে পশুপালনের জন্য প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন ও খাদ্য সরবরাহ ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি কোনো সহযোগিতা প্রায় পাননি বললেই চলে। তবু সব বাধা পেরিয়ে তিনি আজ সফল উদ্যোক্তা।
ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে খামার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে তার। পাশাপাশি স্থানীয়দের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করারও ইচ্ছা আছে বলে জানান তিনি।
তার সাফল্যের স্বীকৃতিও মিলেছে। তিনি পেয়েছেন ‘কৃষি উদ্যোক্তা সম্মাননা ২০২২’। প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনী ২০২৪-এ মহিষ উৎপাদনে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এ ছাড়া সাম্প্রতিক জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহে গরু-মহিষ মোটাতাজাকরণে দ্বিতীয় স্থান, ছাগল পালনে তৃতীয় এবং দুগ্ধ ক্যাটাগরিতে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন।কমলগঞ্জ প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রমা পদ দে বলেন, ‘কঠোর পরিশ্রম ও ধৈর্য থাকলে জীবনে সফলতা আসে। মুঈদ আশিক চিশতী তার অনন্য উদাহরণ। তিনি প্রতিকূলতার মধ্যেও সাফল্যের মুখ দেখেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘চিশতীর খামার আজ অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। এটি কমলগঞ্জের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’ একই সঙ্গে তিনি জানান, কৃষি বিভাগ সব সময় এমন উদ্যোক্তাদের পাশে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

