বঙ্গোপসাগরে নৌ-উপস্থিতি জোরদারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে পাকিস্তান নৌবাহিনী। দেশটির এক জ্যেষ্ঠ নৌ কর্মকর্তা বলেছেন, নতুন হ্যাঙ্গর-শ্রেণির সাবমেরিন বহরে যুক্ত হওয়ায় পাকিস্তান ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগর এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করবে।
পাকিস্তান নৌবাহিনীর কমোডর ওমর ফারুক সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে মন্তব্য করেন। তিনি জানান, চীনে নির্মিত নতুন **পিএনএস হ্যাঙ্গর** সাবমেরিন পাকিস্তানের নৌক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আটটি হ্যাঙ্গর-শ্রেণির সাবমেরিন যুক্ত করার পরিকল্পনা
কমোডর ওমর ফারুকের ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান ধাপে ধাপে হ্যাঙ্গর-শ্রেণির মোট আটটি সাবমেরিন নৌবহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। তাঁর মতে, এসব সাবমেরিন পাকিস্তানের সামুদ্রিক কার্যক্রমের পরিসর বাড়াবে এবং বিভিন্ন কৌশলগত অঞ্চলে উপস্থিতি বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
তিনি নতুন সাবমেরিন প্রকল্পকে পাকিস্তান নৌবাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানসংলগ্ন জলসীমায় পাকিস্তান নৌবাহিনীর কার্যক্রম ছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের একটি সাবমেরিনের নামও ছিল **পিএনএস হ্যাঙ্গর**। তবে যুদ্ধ শেষে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের সরাসরি সামরিক উপস্থিতি কার্যত সীমিত হয়ে যায়।
পরবর্তী কয়েক দশক ধরে পাকিস্তান নৌবাহিনীর প্রধান কার্যক্রম উত্তর আরব সাগরকেন্দ্রিক ছিল।
কেন গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গোপসাগর?
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয় বঙ্গোপসাগর। ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি পরিবহন ও বাণিজ্যের জন্য এই অঞ্চল বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতার কারণে বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এ অঞ্চলে ভারতের শক্তিশালী নৌ-অবস্থান, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কৌশলগত অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের কারণে বিভিন্ন দেশ এখন এই জলরাশিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
আন্তর্জাতিক জলসীমা নিয়ে কী বলছে আইন?
বঙ্গোপসাগরের পুরো এলাকা কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, উপকূলীয় দেশগুলো তাদের উপকূল থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা ও একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের (ইইজেড) ওপর অধিকার প্রয়োগ করতে পারে।
এর বাইরে থাকা আন্তর্জাতিক জলসীমায় বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ আন্তর্জাতিক বিধি অনুসরণ করে চলাচল করতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক জলসীমায় কোনো দেশের নৌযানের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বৈধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন আলোচনা
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের নতুন সাবমেরিন বহর এবং বঙ্গোপসাগরসংক্রান্ত মন্তব্য দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন দেশের নৌ সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের পদক্ষেপ ভবিষ্যতে কৌশলগত ভারসাম্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

