দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং যোগাযোগ অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৪৮ হাজার ২৯২ কোটি টাকা।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় এ প্রস্তাব তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
সড়ক ও সেতু খাতে বড় পরিকল্পনা
অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং নগর পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে সরকার সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
এ লক্ষ্যে মহাসড়ক উন্নয়ন, গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর চার লেনে উন্নীতকরণ এবং সমন্বিত যোগাযোগ কাঠামোর মাধ্যমে মাল্টিমোডাল হাব গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে ৯৪টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ‘সেফটি সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ভিত্তিক বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প পুনরায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া অটোমেটেড ফিটনেস সার্টিফিকেট ব্যবস্থা চালু, পেশাদার চালকদের প্রশিক্ষণ জোরদার এবং প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড গড়ে তোলার জন্য সম্ভাব্য করিডোর চিহ্নিত করা হয়েছে।
ঢাকার যানজট নিরসনে রিং রোড ও রেডিয়াল রোড নির্মাণের পাশাপাশি ছয়টি মেট্রোরেল লাইনের সমন্বয়ে আধুনিক গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। এর সঙ্গে মনোরেলভিত্তিক ফিডার নেটওয়ার্কও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকার পর্যায়ক্রমে পুরোনো বাসের পরিবর্তে ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি দ্বিতীয় যমুনা সেতু, তৃতীয় মেঘনা সেতু এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। ইলেকট্রনিক টোল ও স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
রেলপথে আধুনিকায়ন ও উচ্চগতির ট্রেনের পরিকল্পনা
অর্থমন্ত্রী বলেন, নিরাপদ ও প্রযুক্তিনির্ভর রেলব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশের সব জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বন্দরগুলোর সঙ্গে রেল সংযোগ সম্প্রসারণ, আধুনিক লোকোমোটিভ, ক্যারেজ ও ওয়াগন সংগ্রহ এবং সৈয়দপুর ও পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে।
স্থানীয়ভাবে কোচ ও লোকোমোটিভ সংযোজন, ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ এবং আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থাও চালু করা হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন ও উচ্চগতির রেল সংযোগ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ঢাকা-কুমিল্লা অংশে কর্ডলাইন নির্মাণ করা হবে। এতে এ পথে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরত্ব কমে আসবে। একই সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে করিডোর প্রতিষ্ঠা এবং চট্টগ্রামকে লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নৌপথ ও বন্দর উন্নয়নে গুরুত্ব
নৌপরিবহন খাতে অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর আধুনিকায়ন এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথের সক্ষমতা বাড়াতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
এ লক্ষ্যে ড্রেজিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ, কন্টেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং দক্ষতা বৃদ্ধি, নদীবন্দর ও লঞ্চঘাট আধুনিকায়ন এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন ও জেটি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন করা হবে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বে-টার্মিনাল, পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল এবং লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
বিমান ও পর্যটন খাতে নতুন দিগন্ত
অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান এভিয়েশন হাবে পরিণত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এ জন্য জাতীয় এয়ার কানেকটিভিটি গ্রিড গড়ে তোলা, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিক ও যাত্রী হাবে উন্নীত করা এবং কক্সবাজার, যশোর, রাজশাহী ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক গেটওয়ে হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি আধুনিক উড়োজাহাজ কেনার লক্ষ্যে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বিমানবন্দরের প্রায় ৯৪ হাজার বর্গমিটার এলাকায় ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
পর্যটন খাতকে জাতীয় অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার লক্ষ্যে জিডিপিতে এ খাতের অংশীদারিত্ব ৬ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য পর্যটন বিনিয়োগ রোডম্যাপ প্রণয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিমুখী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের গুরুত্ব বিবেচনায় যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে আগামী অর্থবছরে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

