‘দুপুরে ছেলেকে ফোন দিলাম। ওপাশে শুধু সু সু শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। মনে হলো, আমার ছেলে দৌড়াচ্ছে। আমি বললাম, বাবা কোথায় তুমি? ভাত খাবা না? তখন শ্রাবণ বলল, “মা, তুমি ভাত বাড়ো, আমি আসতেছি।” কিন্তু সে আর জীবিত ফিরে আসেনি। সেই ভাতও আর খাওয়া হয়নি।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ছেলে শ্রাবণ গাজীর সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি তুলে ধরেন তার মা শাহজাহান।
‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দিন সাভার নিউমার্কেটের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন শ্রাবণ গাজী। সাভারের ডেইরি ফার্ম এলাকার কোয়ার্টারে শহীদ শ্রাবণের বাবা মান্নান গাজী ও মা শাহজাহান ছেলের শেষ সময়ের স্মৃতিচারণ করেন।
মান্নান গাজী ও শাহজাহান দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে বড় এবং একমাত্র ছেলে ছিলেন শ্রাবণ গাজী। তার বাবা মান্নান গাজী বলেন, ‘আমি ডেইরি ফার্মে মাস্টাররোলে চাকরি করি। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে আমাদের চারজনের সংসার ছিল। ২০২২ সালে সাভার ল্যাবরেটরি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করে শ্রাবণ। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিল। কিন্তু কোটার কারণে সে ভর্তি হতে পারেনি। তখন থেকেই সে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিল।’
তিনি জানান, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মালয়েশিয়ার টুঙ্কু আব্দুল রহমান ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজিতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন শ্রাবণ। পড়াশোনার জন্য মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষা শেষে ১৬ জুলাই কোটা আন্দোলনের সময় দেশে ফেরেন।
মান্নান গাজী বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় পড়াশোনার পাশাপাশি শ্রাবণ খণ্ডকালীন চাকরি করত। বিদেশ থেকে উপার্জিত পাঁচ হাজার টাকা আমাকে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি ছেলের টাকা নিতে চাইনি।’
শ্রাবণের মা শাহজাহান বলেন, ‘শ্রাবণ খুব সাহসী ছিল। ৫ আগস্ট সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘুম থেকে উঠে বলল, “মা, আমি যুদ্ধে যাইতেছি।” আমি বললাম, “তুই তো আমার একমাত্র ছেলে। যদি দুইটা ছেলে থাকত, একজনকে যুদ্ধে যেতে দিতাম। কিন্তু তুই গেলে আমি কী নিয়ে থাকব?” তখন সে বলল, “মা, আমি ডেইরি ফার্মের ভেতরের ক্যান্টিনের দিকে থাকব।” এরপর আমি তাকে যেতে দিই।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুপুরে আমি ছেলেকে ফোন দিই। মোবাইলে শুধু সু সু শব্দ শুনতে পাই। মনে হলো, সে দৌড়াচ্ছে। আমি বললাম, “বাবা, তুমি কোথায়?” সে বলল, “মা, আমি ডেইরি গেটে আছি।” আমি বললাম, “বাবা, তুমি খেতে আসবে না?” শ্রাবণ বলল, “মা, তুমি ভাত বাড়ো, আমি আসতেছি।” এই বলে ফোন রেখে দেয়। কিন্তু তখনই আমার মনে হয়েছিল, আমার ছেলে কোনো বিপদে আছে। পরে আমি তার বাবাকে ফোন করে বলি, ছেলেকে নিয়ে বাড়ি আসতে।’
শ্রাবণের বাবা মান্নান গাজী জানান, দুপুরে শ্রাবণের এক বন্ধু ফোন করে জানায়, সে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো হাতে বা পায়ে গুলি লেগেছে। পরে জানতে পারেন, মাথায় গুলি লেগেছে। তিনি বলেন, ‘তখনই বুঝে গিয়েছিলাম, পরিস্থিতি ভালো নয়। জানতে পারলাম, তাকে গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। অনেক কষ্ট করে হাসপাতালে গিয়ে দেখি, আমার ছেলে আর বেঁচে নেই।’
পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রাবণের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সাভার ডেইরি ফার্ম এলাকায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে ডেইরি ফার্ম কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
ছেলের হত্যার বিচার দাবি করে শাহজাহান বলেন, ‘আমার ছেলেকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আমি এই হত্যার সঠিক বিচার চাই। কিন্তু আজও দোষীরা পলাতক। মৃত্যুর আগে আমি ছেলের হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই।’

