স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ ও প্রবাসী সেবাসহ বিভিন্ন সরকারি খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের গতি আরও বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট ও সংশ্লিষ্ট কর্মপরিকল্পনায় নাগরিকসেবাকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও সহজলভ্য করতে একাধিক নতুন ডিজিটাল সেবা চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড, শিক্ষার্থীদের জন্য স্বতন্ত্র এডু-আইডি, অনলাইন সামাজিক সুরক্ষা প্ল্যাটফর্ম, স্বয়ংক্রিয় কর ফেরত ব্যবস্থা, ডিজিটাল বিনিয়োগসেবা, কৃষক কার্ড ও প্রবাসী কার্ড। সরকারের আশা, এসব সেবা চালু হলে কাগজপত্রের ব্যবহার কমবে এবং নাগরিকেরা ঘরে বসেই অনেক সরকারি সেবা নিতে পারবেন।
স্বাস্থ্যসেবায় আসছে ইউনিভার্সাল হেলথ কার্ড
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় দেশের সব নাগরিকের জন্য ইউনিভার্সাল হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। এটি সমন্বিত রোগী ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা (ইন্টিগ্রেটেড পেশেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) ও রেফারেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
এর ফলে দেশের যেকোনো সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রোগীর আগের চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রেসক্রিপশন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য দ্রুত পাওয়া যাবে। এতে চিকিৎসার মান উন্নয়ন, চিকিৎসাগত ভুল কমানো এবং অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের পুনরাবৃত্তি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া দেশের ২২টি নিউক্লিয়ার মেডিসিন ইনস্টিটিউটকে একটি সমন্বিত অনলাইন তথ্যব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষায় এডু-আইডি ও ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’
শিক্ষা খাতে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া পর্যায়ক্রমে চালু করা হবে—
* প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য স্বতন্ত্র এডু-আইডি
* মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ
* শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনা মূল্যের ওয়াই-ফাই
* ডিজিটাল লাইব্রেরি
* কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবটিক্স, কোডিং ও ডিজিটাল সাক্ষরতা শিক্ষা
সামাজিক সুরক্ষায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনায় ফ্যামিলি কার্ড ও ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মোবাইল আর্থিক সেবা ও ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সরাসরি উপকারভোগীদের কাছে সরকারি ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রায় ৪ কোটি উপকারভোগীর তথ্য সংরক্ষণের জন্য একটি কেন্দ্রীয় সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেম তৈরি করা হচ্ছে।
এর মাধ্যমে একই ব্যক্তি একাধিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ কমবে এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের সেবা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
বিনিয়োগ ও ব্যবসাসেবা হবে অনলাইনে
বিনিয়োগকারীদের জন্য ডিজিটাল সিঙ্গেল উইন্ডো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আবেদন, যাচাই, অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রদানসহ বিভিন্ন সেবা অনলাইনে পাওয়া যাবে। আবেদন নিষ্পত্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে সাত কর্মদিবসের মধ্যে।
এ ছাড়া বাংলাবিজ নামে সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার বিভিন্ন অনুমোদন দ্রুত দেওয়া হবে।
রপ্তানিকারকেরা বিজনেস সিঙ্গেল উইন্ডো (বিএসডব্লিউ) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক সার্টিফিকেট অব অরিজিন (সিওও) এবং অন্যান্য সেবা অনলাইনে পাবেন। কোম্পানির নাম ছাড়পত্র ও নিবন্ধনও ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় সেবা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) স্বয়ংক্রিয় ও ফেসলেস ট্যাক্স রিফান্ড ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে।
এর মাধ্যমে অতিরিক্ত পরিশোধিত কর সরাসরি করদাতার ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। পাশাপাশি আয়কর রিটার্ন ও ভ্যাট রিটার্ন অনলাইনে দাখিল বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে সরকারি রাজস্ব জমার ক্ষেত্রে এ-চালান ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হবে।
কৃষকদের জন্য ডিজিটাল সেবা
কৃষি খাতে কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিকভাবে ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে ডিজিটাল সেবার আওতায় আনা হবে।
কৃষকের অ্যাপ ব্যবহার করে দেশের সব উপজেলায় কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্যশস্য বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনায় পরীক্ষামূলকভাবে ফুড-ফ্রেন্ডলি ডিস্ট্রিবিউশন অ্যাপ চালু করা হয়েছে।
প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী কার্ড
প্রবাসী কর্মীদের জন্য প্রবাসী কার্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে কর্মীর ব্যক্তিগত তথ্য, দক্ষতা ও চাকরির তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।
কার্ডটি ব্যাংকিং পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় দ্রুত ও নিরাপদে রেমিট্যান্স পাঠানো সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে বিদেশে কর্মসংস্থানের পুরো প্রক্রিয়া ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্ম–এর মাধ্যমে ডিজিটাল করা হচ্ছে। শ্রমিকদের তথ্য সংরক্ষণে গড়ে তোলা হচ্ছে লেবার ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম।
পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়ও প্রযুক্তির ব্যবহার
পরিবেশ ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায়ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—
* বনসৃজন পর্যবেক্ষণে ট্রি মনিটরিং অ্যাপ
* ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পর্যবেক্ষণে এআইভিত্তিক ড্যাশবোর্ড
* ২ হাজার ৭০০টির বেশি জ্বালানি ট্যাংক লরির ডিজিটাল নজরদারি
* স্যাটেলাইট ও এসএমএসের মাধ্যমে দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা
প্রযুক্তিনির্ভর সরকারি সেবার দিকে অগ্রযাত্রা
সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, সামাজিক সুরক্ষা, কর ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ ও প্রবাসীসেবাসহ বিভিন্ন খাতে ডিজিটাল উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরকারি সেবা আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও নাগরিকবান্ধব হবে। একই সঙ্গে তথ্য ব্যবস্থাপনা সহজ হওয়ার পাশাপাশি সেবাগ্রহীতাদের সময় ও ব্যয়ও কমবে।

