জনগণের ভোগান্তি নিরসন এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লং মার্চে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অংশ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
আখতার হোসেন বলেন, ‘১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর আমরা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লং মার্চের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেই লং মার্চ কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে এবং সেখানে জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির অংশগ্রহণ কীভাবে হবে, সে বিষয় নিয়ে আজ আমাদের একটি মিটিং ছিল।’
তিনি বলেন, দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সভাপতিত্বে জাতীয় নাগরিক পার্টির সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং নেতাদের নিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আখতার হোসেন বলেন, ‘আমরা সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের বর্তমান যে প্রেক্ষাপট দেখছি, তাতে জনভোগান্তি নিরসন করা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা—সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা এই লং মার্চে উপস্থিত হচ্ছি।’
এনসিপির সদস্যসচিব বলেন, সরকার গঠনের ছয় মাস সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু এই ছয় মাসজুড়ে সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করছে না। সরকার জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের সরবরাহও নিশ্চিত করতে পারছে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালো নয়।
তিনি বলেন, ‘জনগণের যে দাবি-দাওয়াগুলো রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আমরা সংসদে কথা বলছি। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে এই দাবি-দাওয়াগুলোকে গ্রাহ্য করার মতো মানসিকতা প্রদর্শন করা হয়নি।’
‘পাঁচ-ছয় হাজার গাড়ি থেকে কমিয়ে এক হাজারে নিয়ে এসেছি’
জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে আখতার হোসেন বলেন, সরকার ক্ষমতায় আসার পর জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। কয়েক দফা বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এরপরও ঘরে ঘরে লোডশেডিং হচ্ছে।
তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলে দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং থাকে। কোনো কোনো অঞ্চলে এর চেয়েও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকে না।
আখতার হোসেন বলেন, ‘এটা চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। নিজে গ্রামে গিয়েছিলাম। গ্রামের মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। গ্রামের কৃষকেরা এখন সার পাচ্ছেন না। অথচ এখন এমন মৌসুম চলছে যে এ মৌসুমে কৃষকেরা যদি সার না পান, তাহলে তারা ফসল উৎপাদনে ব্যাহত হবেন এবং আমাদের কিন্তু না খেয়ে মরতে হবে। এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, গ্যাসসংকটের কারণে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় পারিবারিকভাবে রান্নাবান্নার কাজে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল মানুষও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
আখতার হোসেন বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে জ্বালানি সেক্টরটাতে সরকার চূড়ান্ত একটা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এবং তারা সব সময় এই ব্যর্থতাকে আড়াল করার একটা চেষ্টা করছে।’
সরকারের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এমন ধরনের কথা তারা বলেছে যে বিদ্যুতের নাকি সংকট নেই, লোডশেডিং নাকি হয় না। বরং এক পোল থেকে আরেক পোলে বিদ্যুৎ যেতে যে সময়টা প্রয়োজন হয়, সেই সময়ের আধিক্যের কারণে নাকি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে যে দেরি হয়, সেটাকেই নাকি লোডশেডিং বলা হচ্ছে।’
এটিকে জনগণের ভোগান্তি আড়াল করা এবং জনগণের প্রকৃত সংকটকে আমলে না নেওয়ার মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আখতার হোসেন বলেন, ‘আমরা এটা খেয়াল করে দেখেছি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটা নাজুক অবস্থার মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই, রাহাজানির মতো ঘটনা ঘটছে।’
তিনি বলেন, এমনকি একজন শিক্ষিকা, যিনি চিকিৎসা করানোর জন্য ঢাকায় এসেছিলেন, সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইকারীর হামলায় রাস্তায় পড়ে আহত হন এবং পরে তাঁর জীবনের অবসান ঘটে।
আখতার হোসেন বলেন, ‘এ ধরনের একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে বাংলাদেশের মানুষেরা সংসদ ভবনের আশপাশের এলাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত কোথাও এখন আর নিরাপদভাবে বসবাস করতে পারছেন না।’
তিনি বলেন, বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে চারণভূমিতে মহিষ চরাতেও চাঁদা দিতে হচ্ছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার নিয়ে প্রশ্ন
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে আখতার হোসেন বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন যে বাংলাদেশের মানুষদের ২৪-এর অভ্যুত্থানের সময়কালে একটা গণহত্যার মতো পরিবেশের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। একটা মানবতাবিরোধী অপরাধ বাংলাদেশের মানুষের ওপর সংঘটিত হয়েছে।’
তিনি বলেন, সেই আসামিদের আদালতে উপস্থাপন করা হলে তাঁরা হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় উপস্থিত হচ্ছেন। বিভিন্নভাবে এই অপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সাজা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আখতার হোসেন বলেন, ‘আমরা নাম ধরে ধরে বলতে পারব, একেবারে সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত প্রত্যেকটা জায়গাতেই সরকার তাদের দলের নেতাকর্মীদের পদায়িত করছেন।’
তিনি অভিযোগ করেন, ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রশাসক হিসেবে বসানো হচ্ছে। বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানেও নেতাকর্মীদের পদায়ন করে নানাভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কবজা করা হচ্ছে।
মানবাধিকার ও গুম প্রতিরোধ আইন নিয়ে সমালোচনা
মানবাধিকার ও গুম প্রতিরোধ আইন প্রসঙ্গে এনসিপির সদস্যসচিব বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষদের সরকার যে নতুন একটা প্রত্যাশার কথা বলেছিল, সে প্রত্যাশার পথে অগ্রসর না হয়ে তারা বরং পেছনের দিকে ফিরে যাওয়ার বন্দোবস্ত করেছে।’
তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশন নিয়ে একটি আইন হচ্ছে, গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ নিয়ে একটি আইন হচ্ছে। সরকার বলেছিল, অধ্যাদেশগুলো ল্যাপস করে দেওয়া হয়েছে, যাতে আরও শক্তিশালী আইন আনা যায়।
তবে আখতার হোসেনের অভিযোগ, শক্তিশালী আইন আনার কথা বলে সরকার এমন দুর্বল আইন নিয়ে আসছে, যাতে গুম, খুন, মানবাধিকার হরণ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত বাহিনীগুলোকে সঠিকভাবে বিচারের আওতায় আনার সুযোগ থাকছে না।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘নানা দিকে ভোগান্তি, সারের সংকট, বিদ্যুতের সংকট, গ্যাসের সংকট এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনগণের একটা নাভিশ্বাস উঠে গেছে।’
আখতার হোসেন বলেন, ‘আমরা ১১ দলীয় ঐক্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমরা জনগণের কাছে যাব। বাংলাদেশের প্রত্যেকটা প্রান্তে আমরা যাব এবং জনগণের পক্ষ থেকে জনগণের ভোগান্তির কথাগুলোকে দেশের মিডিয়ার কাছে তুলে ধরব, সরকারের কাছে তুলে ধরব।’
লং মার্চের কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভাগীয় সমাবেশগুলো করা হয়েছে। এখন বিভাগগুলোতে লং মার্চের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা কিন্তু সরকারকে এখনো পর্যন্ত সময় দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু সরকারকে অবশ্যই সেই সময়টা ন্যায্যভাবে জনগণের কল্যাণে খরচ করতে হবে।’


