দেশে চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় পরিসরে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন শুধু পরিবেশ সুরক্ষার বিষয় নয়; এটি সরাসরি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত।
রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘আসন্ন বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ’ শীর্ষক এক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। সংলাপের আয়োজন করে Centre for Policy Dialogue (সিপিডি)।
জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি, নবায়নযোগ্য খাতে কম বরাদ্দ
সংলাপে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে সিপিডির গবেষক খালিদ মাহমুদ জানান, দেশে বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ। এ খাতে বরাদ্দ ও প্রবৃদ্ধি দুটিই তুলনামূলক কম।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতে বছরে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বরাদ্দ মাত্র ৭৯৫ কোটি টাকা। একই সঙ্গে ৩১টি এলওআই বাতিল হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও কমেছে।
তার ভাষায়, “আমরা কি ভবিষ্যতের জ্বালানিতে বিনিয়োগ করব, নাকি পুরোনো ভর্তুকিনির্ভর ব্যবস্থায় আটকে থাকব?”
‘জ্বালানি খাত অলিগার্কিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা Rashed Al Mahmud Titumir। তিনি বলেন, অতীতে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, আমদানিনির্ভর নীতির কারণে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা দুর্বল হয়েছে এবং ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হয়েছে।
ড. তিতুমীর বলেন, “জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কাঠামোগত বিষক্রিয়া ও স্বার্থান্বেষী চক্র।”
তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, দেশীয় গ্যাস উত্তোলন বৃদ্ধি এবং দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতি উৎপাদনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কৃষিজমি রক্ষা করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের আহ্বান
প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা Rehan Asif Asad বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ হলেও কৃষিজমি রক্ষা করেও প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি বলেন, “কৃষিজমি নষ্ট করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প করা যাবে না।”
বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ইভির ব্যবহার বাড়লে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়বে। তাই চার্জিং অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করেই এ খাতে এগোতে হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য আলাদা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব
সিপিডির গবেষণা পরিচালক Khondaker Golam Moazzem নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, বর্তমান কাঠামোয় টেকসই জ্বালানি উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন কঠিন।
তিনি প্রতি বছর বাজেটের সঙ্গে ‘ন্যাশনাল এনার্জি ট্রানজিশন রিপোর্ট’ প্রকাশেরও প্রস্তাব দেন।
ভর্তুকির টাকা দিয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্ভব ছিল
United International University-এর সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চের পরিচালক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী বলেন, গত বছর বিদ্যুৎ খাতে যে পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব ছিল।
তিনি বলেন, “লিথিয়াম ব্যাটারির আমদানি শুল্ক কমানো গেলে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় অনেক কমে আসবে।”
রুফটপ সোলার ও কৃষিখাতে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা
Infrastructure Development Company Limited (ইডকল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর মোরশেদ বলেন, দেশে প্রায় ১২ লাখ ডিজেলচালিত সেচ পাম্প রয়েছে। এগুলো সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর করা গেলে জ্বালানি খাতে বড় পরিবর্তন আসবে।
তিনি রুফটপ সোলারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
এদিকে Metropolitan Chamber of Commerce and Industry-এর সভাপতি কামরান রহমান বলেন, চা বাগানের অব্যবহৃত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
মাঠপর্যায়ে হয়রানি বন্ধের দাবি ব্যবসায়ীদের
Bangladesh Knitwear Manufacturers and Exporters Association (বিকেএমইএ)-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম অভিযোগ করেন, সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম আমদানিতে মাঠপর্যায়ে নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয়।
তিনি বলেন, নীতিগত সুবিধা থাকলেও বাস্তবে কাস্টমস পর্যায়ে জটিলতার কারণে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে।
সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সম্ভব নয় জ্বালানি নিরাপত্তা
আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা বলেন, শুধু নীতিমালা প্রণয়ন নয়, বরং মাঠপর্যায়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তাঁদের মতে, সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির শুল্ক কমানো, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং কৃষিজমি রক্ষা করে ‘এগ্রি-ভোল্টেইক’ ও রুফটপ সোলারে জোর দেওয়ার মাধ্যমেই বাংলাদেশ টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার দিকে এগোতে পারবে।

