অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ঘুষ, নিয়োগ-পদায়ন বাণিজ্য ও অর্থ পাচারসহ নতুন একাধিক দুর্নীতির অভিযোগে পৃথক অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এ বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ।
তিনি বলেন, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান। নতুন অভিযোগগুলোর বিষয়েও কমিশন যাচাই-বাছাই শেষে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে নতুন অভিযোগগুলো যুক্ত করে অনুসন্ধান করা হবে।
এর আগে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
নতুন অভিযোগের বিষয়ে দুদক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নিয়োগ, বিভিন্ন জেলায় ডিসি পদায়ন বাণিজ্য, বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে টেন্ডার কমিশন গ্রহণ এবং বিদেশে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
৫ দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অবৈধ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার ও বিনিয়োগ করেছেন। তাঁর দুই বোন জামাই ও ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করে বিলাসবহুল ভিলা কেনা, বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং ‘গ্রীন গ্রুপে’ মূলধন যোগানোর অভিযোগ রয়েছে।
সিঙ্গাপুরে অবৈধ উপায়ে ৩ হাজার কোটি টাকা পাচার করে বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলা, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং সুইজারল্যান্ডে দেড় হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে পর্তুগালে জমি কেনার বিষয়টিও অভিযোগে উঠে এসেছে।
দুদক জানায়, নিয়োগ-পদায়নে কমিশন গ্রহণ ও মেগা প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে এই ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের বিষয়টিও সমন্বিতভাবে অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
কমিশন সূত্রে জানা যায়, দুদকে আসা নতুন অভিযোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা করে লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণসহ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের মধ্যে আরও যা রয়েছে
প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাৎ: স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া, ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
নিয়োগ, বদলি ও ঘুষ গ্রহণ: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে কোটি কোটি টাকা লেনদেন, ঢাকা ওয়াসার এমডি হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা উৎকোচ গ্রহণ, এলজিইডির সাবেক চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুর রশীদ খানকে ৫২ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে নিয়োগ এবং ৬৫ কোটি টাকার বিনিময়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে সিইও হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
স্বজনপ্রীতি ও নিজস্ব সিন্ডিকেট: গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে তাঁর নিজ উপজেলা মুরাদনগরের জন্য ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, যার বরাদ্দ ও গ্রহণ প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বাবা বিল্লাল হোসেন ও এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহ করতেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়া ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া হেলিকপ্টারে ভ্রমণ করে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় করেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তিনি হোটেল ওয়েস্টিনসহ পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস ও গাড়িতে চলাচল করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ-বদলি ও কেনাকাটাসহ বিভিন্ন কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অনুসন্ধানে দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে।
অভিযোগসংশ্লিষ্ট অন্যরা হলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন ও উপসচিব মো. মাসুম আহমেদ।
অভিযোগ অনুসন্ধানে পরদিন চার ধরনের নথি তলব করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় দুদক। চিঠিতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দায়িত্ব পালনকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে সম্পাদিত সব নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি-সংক্রান্ত নথিপত্র এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট স্মারকমূলে বদলি-সংক্রান্ত নথিপত্র তলব করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে দুদক সূত্রে জানা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে বেআইনি কাজ হাসিলে ঘুষ গ্রহণ ও মানিলন্ডারিং-সংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিদেশে অর্থ পাচার এবং বেআইনি বিটকয়েন লেনদেনের অভিযোগও আছে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি, স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও দুদকে করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অনুসন্ধানের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ওই বক্তব্যের মাধ্যমে তাঁর মানহানি করা হয়েছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর দুর্নীতির অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলামের দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহারের জন্য আইনি নোটিশও দেওয়া হয়।
তবে গত ৯ সেপ্টেম্বর দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান জানিয়েছিলেন, আইন ও বিধি অনুযায়ী আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
ওই দিন সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে দুদকের অনুসন্ধানকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি ও ভয় দেখানোর প্রক্রিয়ার অংশ বলে অভিযোগ করেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
আসিফ মাহমুদ বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো মিথ্যা এবং এই অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য দুর্নীতি খুঁজে বের করা নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করা ও ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ করা। যেসব অভিযোগ মানুষের সামনে আনা হচ্ছে, সেগুলো সবই মিথ্যা বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, এই অনুসন্ধান আসলে অনুসন্ধান নয়; এটি রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার প্রক্রিয়া। ফ্যাসিবাদী আমলে যেভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়ন, ভয় দেখানো ও কথাবার্তা থেকে বিরত রাখা হয়েছিল, একই প্রক্রিয়ায় তারা আবার যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


