রাষ্ট্রকে তরুণ সমাজের দায়িত্ব নিতে হবে। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র বক্তৃতামালায় ও চাপাবাজিতে ব্যস্ত। আর দলীয় নেতারা দাঙ্গাবাজি, চাঁদাবাজি ও লুটপাটে ব্যস্ত। যুব সমাজ নিয়ে কাজ করার সময় ও সুযোগ তাদের নেই—এমন মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।
বুধবার (১২ আগস্ট) আন্তর্জাতিক যুব দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত যুব র্যালিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘আমাদের যুবকেরা অত্যন্ত মেধাবী, পরিশ্রমী ও দেশপ্রেমিক। যে যুবকেরা দেশপ্রেমিক, তাদের দাবিয়ে রাখা যায় না। যে যুবকেরা সৎ, তাদের পিছিয়ে রাখা যায় না। আর যে যুবকেরা সাহসী ও ঐক্যবদ্ধ, সেই যুবকেরা ইতিহাস রচনা করতে জানে।’
জুলাই বিপ্লবের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। সেই তরুণরা নতুন বাংলাদেশ এনে দিয়েছে। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও সম্ভাবনা ছিল, বর্তমান সরকার সেটাকে ম্লান করে দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশকে আগামী দিনের সমৃদ্ধ, মানবিক, উন্নত ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। যুব সমাজকে নির্যাতন-অত্যাচারের মাধ্যমে পিছিয়ে দেওয়া, রাষ্ট্র ধ্বংসের অপচেষ্টা, রাষ্ট্রীয় তছরুপ, দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ পাচারের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে দেশকে এগিয়ে নিতে গণভোটের মাধ্যমে আসা গণরায়ের বাস্তবায়ন করতে হবে।
হামিদুর রহমান আযাদ আরও বলেন, ‘এখানে সমাজের প্রতিভার লালন এবং তাদের সামাজিক, নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে উন্নয়নের রূপরেখা দেওয়া আছে। এই সরকার কেন তা বাস্তবায়ন করতে চায় না?’
তিনি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়িত হলে মানবাধিকার কমিশন স্বাধীন ও শক্তিশালী হবে। মানবাধিকার কমিশন শক্তিশালী হলে অতীতে যেভাবে রাজনৈতিক কারণে যুব সমাজকে গুম ও খুন করা হয়েছে, তা বন্ধ হবে।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘আপনারা কি চান আপনার ভাইয়েরা গুম হোক? আপনারা কি চান আপনার সন্তান গুম হয়ে যাক, জীবনতন্ত্রের শিকার হোক? এটা চান? তাহলে সরকারকে বলব, অবিলম্বে তা বাস্তবায়ন করুন।’
তরুণদের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, যুব সমাজ উদ্যোক্তা হতে চায়, আবিষ্কারক হতে চায়, বিজ্ঞানী হতে চায়। তারা নিজেদের প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে দেশ গড়তে এবং দেশের নেতৃত্ব দিতে চায়। শুধু রাজনৈতিক কারণে তাদের দাবিয়ে রাখার অপচেষ্টা হলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাক—এটা সরকার চায় না।
দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার দাবি জানিয়ে জামায়াতের এই নেতা বলেন, সংস্কার হলে দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাধীন ও শক্তিশালী হবে। সরকারের ‘নবউদীয়মান সন্ত্রাসী’ ও চাঁদাবাজদের চাঁদাবাজি এবং দুর্নীতির জন্য জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। সরকারের এমপি-মন্ত্রীদের দুর্নীতি ও লুটপাটেরও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, ‘আপনারা কি চান বাংলাদেশকে আবার অর্থনৈতিক দুর্বল অবস্থায় সেই তলাবিহীন ঝুড়ির ইতিহাসের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে? যদি না চান, তাহলে সরকারকে বলব, জনগণের দাবি পূরণ করুন। জনগণের রায় বাস্তবায়ন করুন। অবিলম্বে সংস্কার পরিষদ গঠন করে সংস্কার করুন।’
তরুণদের বেকারত্ব নিয়ে উদ্বেগ
তরুণদের বেকারত্বের প্রসঙ্গ তুলে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘আজও বাংলাদেশের মানুষ বেকারত্বের জ্বালায় ভুগছে। তরুণ সমাজ, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত প্রতি পাঁচজন তরুণের মধ্যে একজন বেকার। এবার অঙ্ক মিলান, কত শতাংশ বেকার আছে।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে যুব সমাজকে কর্মসংস্থান ও কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার কোনো পরিকল্পনা নেই।
শিক্ষায় সর্বোচ্চ বাজেট দেওয়ার কথা বলা হলেও শিক্ষাঙ্গনে দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘আমরা শিক্ষায় সর্বোচ্চ বাজেট দিয়েছি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার জন্য। কিন্তু আমরা দেখছি, আপনারা শিক্ষায় বাজেট দিয়েছেন শিক্ষাঙ্গন দখল করে চাঁদাবাজির বিস্তার করার জন্য, ছাত্রদলের মাধ্যমে ঠিকাদারি ও টেন্ডারবাজি করার জন্য। না হয় আলিয়া মাদ্রাসা দখল করতে গেলেন কেন? জঘন্য হামলা কেন? ঢাকা কলেজে হামলা কেন? বাংলা কলেজে হামলা কেন?’
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে এবং শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে তরুণেরা শিক্ষিত ও দক্ষ হয়ে দেশ গড়বে এবং দেশের ভবিষ্যৎ রচনা করবে।
তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান
তরুণদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাগ্রত ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমাদের দায়িত্ব দেন। এই তরুণ সমাজ আমরা গড়ে তুলব।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের এই তরুণরাই বিদেশে যায়, পড়ালেখা করে, আর ফিরে আসে না। কারণ তারা জানে, তাদের মেধার মূল্যায়ন হয় না। শিক্ষিত ও যোগ্য তরুণেরা উচ্চশিক্ষা লাভ করে দেশে ফিরে এলেও অন্য দেশের শ্রমিকের সমান বেতনও এখানে পায় না। ঠিক সুবিধা পায় না, গবেষণার সুযোগও পায় না। ফলে বিদেশে পাড়ি দিয়ে সেখানে তারা বিজ্ঞানী হয়, আবিষ্কার করে।’
বিদেশে বাংলাদেশি তরুণদের মেধার প্রশংসা করা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিদেশে ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তারা আমাদের বলে, তোমার দেশের সন্তানরা অনেক মেধাবী। কিন্তু সেই মেধার সুযোগ তোমার দেশে নেই।’
তিনি বলেন, ‘আমার দেশের মেধাবীরা এখানে আমাদের ড্রোন আবিষ্কার করে দিতে পারে, নতুন নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত করতে পারে। এর মধ্য দিয়ে তোমার সোনার সন্তানরা আমার দেশের সোনালি ভবিষ্যৎ রচনা করে দিতে পারে।’
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘তোমরা যদি তোমাদের দেশে তাদের সুযোগ দিতে, বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে যেত। মেধার মূল্যায়নের অভাবে তরুণদের মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে। আজকে এই জায়গা থেকে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনতে হবে।’
‘দেশকে আর পিছিয়ে যেতে দেব না’
অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আজকের এই দিবসে আমরা শুধু বক্তৃতা নয়, অঙ্গীকারবদ্ধ হই। আমরা এগিয়ে যাওয়ার জন্য শপথ গ্রহণ করি। আজ ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা শপথ নিই, আমরা আর দেশকে পিছনে যেতে দেব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘শহীদদের রক্ত এবং আহত বীরদের ত্যাগের প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে আমরা আরেকটি আওয়াজ দেব। সেটা হচ্ছে, সরকার বাহাদুর, তরুণদের যোগ্য করে গড়ে তুলে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিন। অন্যথায় সেখান থেকে নেমে আসুন। অন্যরা এসে আমরা গিয়ে, ইনশাআল্লাহ, তরুণদের গড়ে তুলব।’
তরুণদের প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সবাই কি সেভাবে প্রস্তুত আছেন? সেই অঙ্গীকারকে আমরা নিলাম। এই শপথ থেকে আমরা বলি, হতে পারে, ইনশাআল্লাহ এই ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে কেউ আর দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’
শেষে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে, যুব সমাজের জয় হোক, বাংলাদেশের জয় হোক, দেশবাসী ও জাতির উন্নয়ন সর্বত্র প্রতিফলিত হোক।’
এ সময় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি ও সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেনসহ মহানগরের নেতারা র্যালিতে অংশ নেন।

