উচ্চ মাধ্যমিকের চূড়ান্ত পরীক্ষার মাত্র কয়েক দিন আগে গাজার মধ্যাঞ্চলে তাঁদের অস্থায়ী আশ্রয়ের বিপরীত পাশের একটি বাড়িতে বোমা হামলা হয়। ১৮ বছর বয়সী সাবা রাবাহ ও তাঁর পরিবার তখন সবকিছু ফেলে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
যুদ্ধের মধ্যে এটিই ছিল তাঁর জীবনের সর্বশেষ দুর্ভোগ। এর আগে তিনি যুদ্ধে বাবাকে হারিয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে পারিবারিক বাড়ি। একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে পুরো পরিবারকে।
তবে সব প্রতিকূলতা জয় করে ফিলিস্তিনের জাতীয় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা ‘তাওজিহি’র বিজ্ঞান বিভাগে সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করেছেন সাবা রাবাহ।
বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, গাজার মধ্যাঞ্চলের আল-মাগাজি শরণার্থী শিবিরে স্বজন ও প্রতিবেশীদের উপস্থিতিতে সমাবর্তনের পোশাক পরে সাবা বলেন, ‘আমি ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ নম্বর পেয়েছি। বিজ্ঞান বিভাগে সারা দেশে প্রথম হয়েছি।’
২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর গাজায় এবারই প্রথম ‘তাওজিহি’ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো গত জুনে গাজা, ইসরাইল-অধিকৃত পশ্চিম তীর, মিসর এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর বসবাসকারী আরও কয়েকটি দেশে একযোগে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গাজার অধিকাংশ স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এতে কয়েক হাজার শিশু আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
বাড়িঘর ও পুরো পাড়া ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর টিকে থাকা অনেক স্কুল ভবনই কয়েক লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
এ বছর প্রায় ৮৯ হাজার শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে ছিল ২৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছেন সাবা রাবাহ।
তিনি এই সাফল্য প্রয়াত বাবা ফায়েদ রাবাহ, মা, ভাইবোন এবং শিক্ষকদের উৎসর্গ করেছেন।
ফল প্রকাশের পর তাঁদের পরিবারে আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ঢোলের তালে নাচেন তরুণরা। করতালি ও উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন প্রতিবেশীরা।
সাবা স্বজনদের আলিঙ্গন করেন, ছবি তোলেন এবং ফুলের তোড়া গ্রহণ করেন। দেয়ালে ঝুলছিল তাঁর প্রয়াত বাবার প্রতিকৃতি, যা আনন্দের মধ্যেও হারানোর বেদনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল।
দুই বছরের যুদ্ধের মধ্য দিয়েই এই সাফল্যের পথ তৈরি করেছেন সাবা।
তিনি বলেন, তাঁর বাবা ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ-এর একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন।
সাবা জানান, ২০২৪ সালের জুনে ইসরাইলি বিমান হামলায় তাঁর বাবা নিহত হন।
তবে বাবার মৃত্যুর আগেই আল-মাগাজি শরণার্থী শিবিরে ইসরাইলি বাহিনী প্রবেশ করলে তাঁদের পরিবার দুই দফা বাস্তুচ্যুত হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তাঁদের বাড়িও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
সাবা বলেন, ‘আমরা এতবার বাস্তুচ্যুত হয়েছি যে, সঠিক সংখ্যা এখন আর মনে নেই।’
তিনি বলেন, ‘এত বাস্তুচ্যুতি আর ভয় ছিল। আমাদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার অর্ধেক বই হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু আমি কখনো আমার লক্ষ্য থেকে সরে যাইনি।’
পরীক্ষা চলাকালেও বিপদ ছিল খুব কাছেই।
সাবা বলেন, ‘পরীক্ষার কয়েক দিন আগে আমাদের বাড়ির বিপরীত পাশের বাড়িতে বোমা হামলা হয়। এরপর আমরা আমাদের আশ্রয়ও হারাই।’
বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছিন্নতা তাঁর পড়াশোনাকে আরও কঠিন করে তোলে।
কখনো কখনো তাঁকে ব্যক্তিগত কোচিং করতে এবং পরীক্ষায় অংশ নিতে অন্য এলাকায় যেতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘পথে কী ঘটতে পারে, তা না জেনেই যেতে হয়েছে।’
সাবা বলেন, ‘আমার স্বপ্ন মেডিকেলে ভর্তি হওয়া। এ স্বপ্ন আমার বাবারও ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় আশা, আমার কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতি মিলবে এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ার জন্য আমি পূর্ণ বৃত্তি পাব।’
সাবার ৫২ বছর বয়সী মা ফেরিয়াল আহমেদ রাবাহ বলেন, দীর্ঘ শোক ও দুর্ভোগের পর তাঁদের পরিবারে আবার আনন্দ ফিরে এসেছে।
তিনি স্মরণ করেন, তাঁর মেয়ে অনেক সময় মোবাইল ফোনের টর্চের আলোয় পড়াশোনা করেছে।

