১. নিজের সম্পর্কে একটু বলুন। আপনার উদ্যোগের নাম কী এবং কী ধরনের পণ্য/সেবা নিয়ে কাজ করছেন?
উত্তর: আমার নাম আসফিয়া মুমু। আমি একজন Bakery & Pastry Expert। আমার দেশের বাড়ি দিনাজপুর এবং বর্তমানে ঢাকার মিরপুরে বসবাস করছি। ছোটোবেলা থেকেই ব্যাবসায়িক পরিবেশে বড় হয়েছি।
আমার উদ্যোগের নাম Bake & Learn BD। কেক, পেস্ট্রি, ব্রাউনি, চকলেট, বউভাতের খাবারের ডালা, প্রেগন্যান্সি ফুড ডালা, ফ্রোজেন স্ন্যাকসসহ ১০০টিরও বেশি ফুড আইটেম নিয়ে কাজ করছি। পাশাপাশি বেকিং ও ফুড প্রসেসিংয়ের প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকি।
২. উদ্যোক্তা হওয়ার অনুপ্রেরণা কোথা থেকে পেয়েছেন? কবে থেকে আপনার উদ্যোক্তা যাত্রা শুরু?
উত্তর: আমার বাবা একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। ছোটোবেলা থেকেই ব্যাবসা খুব কাছ থেকে দেখেছি। বাবার মৃত্যুর পর নিজের স্বপ্ন পূরণ এবং হালাল উপার্জনের লক্ষ্য নিয়ে ২০১৭ সালে উদ্যোক্তা হিসেবে পথচলা শুরু করি।
৩. ব্যবসা শুরু করার পেছনের গল্পটা কী?
উত্তর: মাত্র ৩ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে পরিচিতদের কাছে পণ্য বিক্রি শুরু করি। তাদের ভালোবাসা ও উৎসাহে ধীরে ধীরে ব্যাবসা বড় হতে থাকে। লাভের টাকা জমিয়ে যন্ত্রপাতি কিনেছি এবং একের পর এক স্কিল ডেভেলপমেন্ট কোর্স করেছি। বর্তমানে ৯টি প্রফেশনাল কোর্স সম্পন্ন করেছি। এখন নিজেও প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। সুবিধাবঞ্চিত নারীদের বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করছি। পাশাপাশি প্রতি ছুটির দিনে পথশিশুদের জন্য খাবারের আয়োজন করি।
৪. প্রথম বিনিয়োগ কত ছিল? কী পরিমাণ মূলধন নিয়ে ব্যাবসা শুরু করেছিলেন?
উত্তর: মাত্র ৩ হাজার টাকা মূলধন দিয়ে আমার ব্যাবসার যাত্রা শুরু করি।
৫. আপনার পণ্যের বিশেষত্ব কী? নতুন কোনো পণ্য বা সেবা নিয়ে কাজ করছেন কি?
উত্তর: আমার প্রধান লক্ষ্য স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ খাবার পরিবেশন করা। কোনো ধরনের টেস্টিং সল্ট বা প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করি না। পরিচ্ছন্নতা, মান এবং স্বাদের সঙ্গে কখনো আপোশ করি না।
বর্তমানে প্রোটিন লাড্ডু, স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস, ফ্রোজেন ফুড এবং বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ সেবা নিয়েও কাজ করছি।
৬. শুরুতে কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন?
উত্তর: আমার ৬৩ হাজার ফলোয়ার এবং এক হাজারের বেশি রিভিউ থাকা পুরোনো ফেসবুক পেজটি হ্যাক হয়ে যায়। এটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি। এরপর প্রায় দুই বছর নিজের আইডি থেকে ব্যাবসা পরিচালনা করেছি। পরে নতুন করে Bake & Learn BD শুরু করি, যা বর্তমানে সফলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।
৭. কার সমর্থন সবচেয়ে বেশি পেয়েছেন?
উত্তর: আমার পরিবারের সদস্যরাই সবসময় আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা আমাকে মানসিকভাবে উৎসাহ দিয়েছেন এবং নিয়মিত আমার পণ্য কিনে আমাকে আরও এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছেন।
৮. কোনো সংগঠনের সহায়তা পেয়েছেন? তাদের সম্পর্কে কিছু বলুন।
উত্তর: জি। খ তে খাঁটি পরিবার নামক ফেসবুক গ্রুপে যুক্ত হওয়ার পর আমার পরিচিতি অনেক বেড়েছে এবং বিক্রিও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই গ্রুপটি অসংখ্য নারী উদ্যোক্তাকে নিজের পরিচয় তৈরি করার সুযোগ করে দিচ্ছে। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এটি খুবই সহায়ক একটি প্ল্যাটফর্ম। আমার বিশ্বাস, খ তে খাঁটি পরিবার নারীদের স্বাবলম্বী ও সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
৯. কঠিন সময়ে নিজেকে মোটিভেটেড রাখেন কীভাবে?
উত্তর: যখনই কঠিন সময় আসে, তখন ভাবি আমার মায়ের সব স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। এই লক্ষ্যই আমাকে নতুন করে সাহস ও শক্তি দেয়।
১০. উদ্যোক্তা জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনটি? একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি কী?
উত্তর: আমার উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি সম্মাননা পেয়েছি। তবে সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো—আজ আমি নিজের স্বপ্ন পূরণে কারও ওপর নির্ভরশীল নই। আমার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ধৈর্য, সততা এবং নিয়মিত শেখার আগ্রহ।
১১. এমন কোনো ব্যর্থতা আছে যা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছেন?
উত্তর: আমার পুরোনো ব্যাবসায়িক পেজ হ্যাক হয়ে যাওয়ার পর আমি শিখেছি— কখনোই একটি প্ল্যাটফর্মের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা উচিত নয় এবং সবসময় বিকল্প ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে হয়।
১২. এমন কোনো ঘটনা বলুন যা আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে।
উত্তর: যখন দেখেছি দেশের বাইরে থাকা মানুষ আমেরিকা ও কোরিয়ায় যাওয়ার সময় পরিবারের জন্য আমার তৈরি ব্রাউনি, প্রোটিন, লাড্ডু ও চিলি অয়েল নিয়ে যান, তখন বুঝেছি মানুষ আমার কাজের ওপর কতটা বিশ্বাস করেন। এই বিশ্বাসই আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
১৩. কাজ ও পরিবারের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখেন?
উত্তর: রাত জেগে অর্ডারের কাজ করি। দিনের বেলায় সংসারের কাজ, ডেলিভারি এবং কাঁচামাল সংগ্রহের কাজ করি। এভাবেই পরিবার ও ব্যাবসা— দুটোই সামঞ্জস্য রেখে পরিচালনা করি।
১৪. বর্তমান প্রেক্ষাপটে চাকরি না করে ব্যাবসা— কোনটা বেশি বাস্তব বলে মনে হয়?
উত্তর: আমার মতে, বর্তমান সময়ে ব্যাবসাই বেশি বাস্তব ও সম্ভাবনাময়। ব্যাবসা শুধু নিজের আয়ের পথ তৈরি করে না, বরং অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।
১৫. ছোটোবেলায় কী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন?
উত্তর: ছোটোবেলা থেকেই বাবার মতো একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। মানুষের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারব— এটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় ইচ্ছা।
১৬. আপনার ব্যাবসার সবচেয়ে মজার অভিজ্ঞতা কী? এমন কোনো গ্রাহকের গল্প আছে যা আজও মনে পড়ে?
উত্তর: আমার অনেক রিপিট কাস্টমার আছেন, যারা এখন পরিবারের সদস্যের মতো হয়ে গেছেন। বিদেশে থাকা অনেক গ্রাহক দেশে এলে আমার তৈরি প্রোটিন, লাড্ডু, ব্রাউনি ও চিলি অয়েল সঙ্গে করে নিয়ে যান। এই ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
১৭. ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? আগামী ৫ বছরে আপনার ব্যবসাকে কোথায় দেখতে চান?
উত্তর: আমার স্বপ্ন একটি আধুনিক Training Institute গড়ে তোলা, যেখানে নতুন উদ্যোক্তারা হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষ হয়ে নিজেদের স্বাবলম্বী করতে পারবেন।
১৮. যারা এখন উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের জন্য আপনার বার্তা কী?
উত্তর: শুধু লাভের কথা নয়, পণ্যের মান, সততা এবং ভালো ব্যবহারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন। এমন মানের পণ্য তৈরি করুন, যাতে একজন গ্রাহক আজীবনের জন্য আপনার নিয়মিত গ্রাহক হয়ে যান। ধৈর্য ধরুন, কঠোর পরিশ্রম করুন এবং শেখা কখনো বন্ধ করবেন না। সফলতা অবশ্যই আসবে।

