বাংলার কৃষক বীজ বপন করেন শুধু জমিতে নয়, নিজের স্বপ্নেও। একটি আমগাছ বড় হতে বছরের পর বছর সময় লাগে। একটি ফল বাজারে পৌঁছানোর পেছনে থাকে দীর্ঘ প্রতীক্ষা, অগণিত শ্রম, ঋণের বোঝা, প্রকৃতির সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম এবং একটি পরিবারের বেঁচে থাকার আশা।
কিন্তু ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত আসে, যখন মানুষের পরিশ্রম প্রকৃতির রোষে নয়, নীতিনির্ধারণের ভুলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ২০১৪ সালের ফরমালিন আতঙ্ক ছিল তেমনই এক বেদনাদায়ক অধ্যায়, যা আজও বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকের স্মৃতিতে এক অস্বস্তিকর প্রশ্নচিহ্ন হয়ে রয়ে গেছে।
সেই গ্রীষ্মে দেশের বাজারে মৌসুমি ফলের সরবরাহ বেড়েছিল। আম, লিচু, জাম ও পেঁপেতে ভরে উঠেছিল দেশের হাট-বাজার। ঠিক তখনই শুরু হয় বহুল আলোচিত ফরমালিনবিরোধী অভিযান।
রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথে, বিশেষ করে গাবতলী এলাকায়, ট্রাকভর্তি ফল জব্দ করা হয়। বিপুল পরিমাণ ফল ধ্বংস করা হয়, পিষে ফেলা হয়, জনসমক্ষে ফেলে দেওয়া হয়। টেলিভিশনের পর্দা, পত্রিকার পাতা এবং সামাজিক আলোচনায় প্রতিনিয়ত ভেসে আসতে থাকে ফল ধ্বংসের দৃশ্য।
ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মনে এমন এক আতঙ্ক তৈরি হয় যে, ফল খাওয়া যেন বিষ খাওয়ার সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। বাজারে ক্রেতা কমে যায়, ব্যবসায়ীরা পণ্য কিনতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, আর উৎপাদকদের কপালে জমতে থাকে অনিশ্চয়তার ভাঁজ।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। জনস্বাস্থ্য রক্ষার প্রশ্নে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই কঠোরতার ভিত্তি হতে হবে বিজ্ঞান, তথ্য, প্রমাণ এবং দায়িত্বশীলতা।
দুঃখজনকভাবে, সেই সময় ব্যবহৃত পরীক্ষা পদ্ধতি ও প্রযুক্তির নির্ভুলতা নিয়ে পরবর্তীকালে নানা প্রশ্ন ওঠে। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ খাদ্যে ফরমালিন শনাক্তকরণে ব্যবহৃত যন্ত্রের কার্যকারিতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আপত্তি তোলেন। ফলে পুরো অভিযানকে ঘিরে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কিন্তু বিতর্ক শুরু হওয়ার আগেই ক্ষতির বড় অংশ হয়ে গিয়েছিল।
সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে আসে উত্তরবঙ্গের ফলচাষিদের ওপর। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোরসহ দেশের প্রধান আম উৎপাদনকারী অঞ্চলের হাজার হাজার কৃষক হঠাৎ করেই চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যান। সারা বছরের কষ্টে ফলানো ফসলের বাজারে ধস নামে। ব্যবসায়ীরা ক্রয় কমিয়ে দেন, পরিবহন ও বিপণন ব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দেয়, আর বাজারজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অবিশ্বাসের ছায়া।
অনেক কৃষক অভিযোগ করেছিলেন, তাদের ফলে ক্ষতিকর উপাদানের সুস্পষ্ট প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও তারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বহু ব্যবসায়ী ও আড়তদার বড় ধরনের আর্থিক লোকসান গুনেছেন। যাদের সারা বছরের আয় নির্ভর করত একটি মৌসুমি ফলের ওপর, তাদের অনেকেই ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েন। কারও কারও কাছে সেই মৌসুম ছিল শুধু আর্থিক ক্ষতির নয়, জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি।
একজন শহুরে ভোক্তার কাছে একটি আম হয়তো কেবল একটি ফল। কিন্তু একজন কৃষকের কাছে সেটি সন্তানের পড়াশোনার খরচ, পরিবারের চিকিৎসা ব্যয়, ঋণ পরিশোধের উপায় কিংবা সারা বছরের জীবিকার অবলম্বন। যখন একটি ফলের বাজার ধসে পড়ে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি পণ্য নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি সম্পূর্ণ কৃষি অর্থনীতি। ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাজারো পরিবারের ভবিষ্যৎ।
২০১৪ সালের ঘটনাটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং কৃষকের স্বার্থ রক্ষা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। বরং একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কাজ হলো এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।
নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্নে কঠোরতা প্রয়োজন, কিন্তু সেই কঠোরতা যদি বৈজ্ঞানিক যাচাই, স্বচ্ছতা ও বাস্তবতার ভিত্তিতে পরিচালিত না হয়, তাহলে জনস্বার্থ রক্ষার উদ্যোগই জনস্বার্থের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ইতিহাস বলে, আতঙ্ক কখনো টেকসই সমাধান দেয় না। আতঙ্ক বাজার ধ্বংস করে, আস্থা নষ্ট করে এবং উৎপাদককে নিরুৎসাহিত করে। অপরদিকে বিজ্ঞান, গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণ দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তা ও কৃষক—উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
আজ এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তবু রাজশাহী, নাটোর কিংবা চাঁপাইনবাবগঞ্জের অনেক কৃষক সেই সময়ের কথা স্মরণ করেন কষ্ট নিয়ে। কারণ তারা প্রত্যক্ষ করেছেন, একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত কত দ্রুত হাজারো মানুষের জীবিকা, স্বপ্ন এবং আর্থিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি আজ অনেক দূর এগিয়েছে। খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে, রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, কৃষক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। এই অগ্রযাত্রাকে আরও শক্তিশালী করতে হলে অতীতের ভুল থেকেও শিক্ষা নিতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে, তবে কৃষকের ঘাম ও শ্রমের মূল্য ভুলে গিয়ে নয়। কারণ একটি জাতির খাদ্য নিরাপত্তা শুধু পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয় না; তা নিশ্চিত হয় কৃষকের মাঠে, বাগানে এবং তার পরিশ্রমের যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার মধ্য দিয়ে।
২০১৪ সালের ফরমালিন আতঙ্ক তাই শুধু একটি প্রশাসনিক অভিযানের স্মৃতি নয়; এটি নীতিনির্ধারণে বিজ্ঞান, স্বচ্ছতা এবং মানবিকতার প্রয়োজনীয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে যেমন দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন কৃষকের প্রতি ন্যায়বিচার।
রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে যদি মানুষ থাকে, তবে নিরাপদ খাদ্য ও কৃষকের স্বার্থ—দুটিই একসঙ্গে রক্ষা করা সম্ভব। কারণ কৃষকের ক্ষতির ওপর দাঁড়িয়ে কখনো জনকল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা যায় না। টেকসই সমাধান আসে বিজ্ঞান, প্রজ্ঞা, জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচারের সমন্বয় থেকে—আতঙ্ক থেকে নয়।
লেখক : আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা

