ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে হাজারো মানুষের সমাবেশ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে শুরু হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) অল্প সময়ের মধ্যেই জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে আলোচিত রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। সংগঠনটির আহ্বানে শনিবার শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ রোববারও অব্যাহত রয়েছে।
সিজেপির দাবি, ইনস্টাগ্রামে তাদের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ। প্রথমবারের মতো অনলাইন সমর্থকদের রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়ে সংগঠনটি দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজন করে। এতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবী অংশ নেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক সিবিএসই ও নিট পরীক্ষার ব্যবস্থাপনা চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়েছে। পরীক্ষা পরিচালনায় ব্যর্থতার দায় নিয়ে তাঁর পদত্যাগ করা উচিত বলে মনে করছেন তাঁরা।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত দিপকে শনিবার ভারতে ফিরে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বলেন, তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় আছেন। পরে যন্তর মন্তরে উপস্থিত হয়ে তিনি বলেন, দেশের তরুণেরা আর ভয়ের রাজনীতি মেনে নেবে না এবং নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার থাকবে।
বক্তব্যে তিনি ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতির সমালোচনা করে বলেন, প্রকৃত সমস্যা থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে দেওয়ার রাজনীতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে উপস্থিত জনতা বিভিন্ন স্লোগানে অংশ নেয়।
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের বরাতে অভিজিত দিপকে অভিযোগ করেন, গত এক মাস ধরে তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং তাঁদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাকের চেষ্টা এবং পোস্ট সরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন।
অনলাইন প্রভাব নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
সিজেপির অভিযোগ, মোদি সরকার তাদের ক্রমবর্ধমান অনলাইন প্রভাব সীমিত করার চেষ্টা করছে। সংগঠনটির দাবি, ইনস্টাগ্রামে তাদের অনুসারীর সংখ্যা বিজেপির তুলনায় প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বেশি। এ ছাড়া ভারতে তাদের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টও ব্লক করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়।
অভিজিত দিপকে আরও বলেন, শাসক দলের কিছু নেতার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে সিজেপির অধিকাংশ অনুসারী পাকিস্তান বা ভারতের বাইরের দেশ থেকে এসেছে। তবে তিনি এ অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
বাড়তে থাকে জনসমাগম
দিনভর যন্তর মন্তরে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বিক্ষোভকারীরা মূলধারার গণমাধ্যমের একাংশের সমালোচনা করে স্লোগান দেন এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
শনিবার বিকেলে আন্দোলনে যোগ দেন শিক্ষা সংস্কারক ও জলবায়ু কর্মী সোনম ওয়াংচুক। এর আগে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ৫ জুনের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করলে তিনি আন্দোলনে শামিল হবেন।
ভারতীয় চলচ্চিত্র থ্রি ইডিয়টস-এর জনপ্রিয় চরিত্র ‘র্যাঞ্ছো’র অনুপ্রেরণা হিসেবে যাঁর নাম প্রায়ই আলোচনায় আসে, সেই সোনম ওয়াংচুকের উপস্থিতি আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
২১ দিনে অনলাইন থেকে রাজপথে
সিজেপির এক্স পোস্টে জানানো হয়, ভারতের সংবিধানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে যন্তর মন্তরে সকাল ১০টা থেকে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত দিপকে সেখানে যোগ দেন।
মাত্র ২১ দিন আগে, গত ১৬ মে সিজেপির যাত্রা শুরু হয়েছিল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। শুরুতে এটি ছিল ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্রচারণা। তবে শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহির অভাব, পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক, তরুণদের হতাশা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের বাস্তবতায় এটি দ্রুত বৃহত্তর জনআন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শক্তি এবং শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তরুণদের জমে থাকা ক্ষোভের সমন্বয়েই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ এখন ভারতের রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

