নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার মুনসেফেরচর গ্রামের মেয়ে কামরুন নাহার। ছোটবেলা থেকেই পরিশ্রমী, স্বপ্নবান এবং আত্মনির্ভরশীল হতে চাওয়া এই নারী আজ “RK Fashion & Jewellery”-এর উদ্যোক্তা। গহনা, মেয়েদের পোশাক, রেজিন ক্রাফট, হোমমেড আচার এবং টেইলারিং—বহুমুখী পণ্য নিয়ে এখন তিনি চলছেন অনলাইন–অফলাইন ব্যবসার দ্বৈত অঙ্গনে।
কিন্তু এই পথ এত সহজ ছিল না—ছিল সংগ্রাম, ছিল বাধা, ছিল থমকে যাওয়া সময়ের দীর্ঘশ্বাস।
কামরুন নাহারের শৈশব কেটেছে নরসিংদীর গ্রামে। গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে স্কুলজীবন টঙ্গীতে—নোয়াগাও এম এ মজিদ মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন তিনি। কলেজে ভর্তি হন টঙ্গী সরকারি কলেজে। কিন্তু ঠিক ফার্স্ট ইয়ার পরীক্ষার পরই বাবার সিদ্ধান্ত—বিয়ে। যুগের নিয়ম, সময়ের বাধ্যবাধকতা আর পারিবারিক চাপ এড়ানোর সুযোগ ছিল না। ১৯৯৯ সালেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় তাঁকে।
স্বামীর সমর্থন থাকলেও পরিবারের অন্য সদস্যদের কঠোরতা এবং বড় বউ হিসেবে দায়িত্ব—সব মিলিয়ে পড়ালেখা থেমে যায়। পরে চাকরির সুযোগ এলেও “বাড়ির বউ চাকরি করবে কেন”—এই সামাজিক বাধা তাঁকে পিছিয়ে দেয় বারবার।
২০০১ সালে প্রথম সন্তানের জন্ম। সেলাই শেখা ছিল মায়ের কাছ থেকে পাওয়া দক্ষতা। নিজের পোশাক নিজেই বানাতেন তিনি। পরে ভাবলেন কিছু একটা শুরু করবেন। চট্টগ্রামে স্বামীর দোকান থাকার সুবাদে সেখানে শুরু করেন টেইলারিং। কিন্তু পারিবারিক টানাপোড়েনে সেটিও চালিয়ে যেতে পারেননি।
চট্টগ্রাম থেকে ফিরে আবার ঘরে বসেই শুরু সেলাই কাজ। ২০০৬ সালে জন্ম নিল ছোট ছেলে। সংসার, সন্তান—সব সামলে সেলাই চলতেই থাকে। কিন্তু নিজের উন্নতি, নিজের একটা জায়গা তৈরি করার ইচ্ছা কখনো থামে না।
এদিকে বড় ছেলে স্কুল-কলেজে উঠতে উঠতে শিখে ফেলে ফ্রিল্যান্সিং। তার কাছ থেকেই স্মার্টফোন ব্যবহার শেখেন কামরুন নাহার। পরে ছেলে তাঁকে অনলাইন ব্যবসার আইডিয়া দেয়। ছোট ছেলে খুলে দেয় ফেসবুক আইডি। এরপর শুরু হয় নতুন পথচলা।
মাত্র ৭০০০ টাকা মূলধন নিয়ে কামরুন নাহার শুরু করেন “RK Fashion & Jewellery”। প্রথমে গহনা, পরে যুক্ত হয় থ্রিপিস, টেইলারিং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য—বিশেষ করে হোমমেড আচার।
তারপর নরসিংদী জেলা নারী উদ্যোক্তা গ্রুপে যুক্ত হন। সাপ্তাহিক পণ্য প্রদর্শনী হাটে স্টল নেন, যাতে অনলাইন–অফলাইন দু’দিকেই প্রকাশ পেতে থাকে তাঁর কাজ।
পরবর্তীতে আয়শা আক্তার পলি আপুর রেজিন কোর্সে ভর্তি হয়ে রেজিনের চুড়ি, কানের দুল, ঘড়ি, ফটো ফ্রেমসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে নেন নিজের তালিকায়। সেলাইয়ের পাশাপাশি যুক্ত হয় এই নতুন সৃজনশীলতা।
আজ তাঁর উদ্যোক্তা জীবন ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। তিনি এখনো নিজেকে সফল মনে না করলেও বিশ্বাস করেন—একদিন বড় হব, অন্য নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করব।
শেষে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন শারমিন সুলতানা আপুকে—নিজের উদ্যোক্তা গল্প লিখতে অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্য।
সংগ্রাম, দায়িত্ব, বঞ্চনা—সবকিছু জয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়া নারীর নামই কামরুন নাহার।
নরসিংদীর এই নারী উদ্যোক্তা প্রমাণ করছেন—চাই শুধু ইচ্ছা আর চেষ্টা, তখনই বদলে যায় জীবনের পথ।

