আসসালামু আলাইকুম
আমার নাম ফাতেমা আক্তার
আমার পেইজের নাম Mariya Fashion house
বাবা-মায়ের বড় মেয়ে খুব আদরের। ছোট থেকে ছবি অংকন করতে ভীষণ পছন্দ করতাম, মা অনেক রং পেন্সিল, ড্রয়িং খাতা কিনে দিয়েছে। সময়ের ব্যবধানে পড়ার চাপে সেই আঁকা বন্ধ হয়ে যায়।
তারপর যখন একটু বড় হলাম ক্লাস নাইন তখন শুরু হলো অন্য সখ, সেলাই করতে খুব ভালো লাগতো হাতের কাজের, অনেক ওয়ালমেট তৈরি করেছি এবং ড্রেসে নিজের পছন্দমত সুই সুতার কাজ করতাম।
এসএসসি পরীক্ষা যখন শেষ হলো তিন মাসের ছুটি মা বললেন সেলাই মেশিনের কাজটা শিখে নিতে শিখেছিলাম শখের বসে।
বিয়ের পরে একটা সময় আসলো যখন দেখা যায় নিজের হাতে কোন টাকা ছিল , হাজব্যন্ডকে বললে উনি কখনো হাতে টাকা দিতেন না। প্রয়োজন মত সব কিনে দিতেন কিন্তু নিজের হাতে টাকা থাকলে নিজের পছন্দমত কেনাকাটা বা সখ পূরণ করা যায়, যেটা নিজের হাতে টাকা না থাকলে হয় না, তাই একসময় শিক্ষকতার চাকরিতে জয়েন করি,
সেখানে কয়েকজন কলিকের সাথে কথা বলে চিন্তা করেছিলাম যেহেতু হাতের কাজ তো জানি, আর আঁকতেও পারি, তাই আমরা ডিসিশন নেই হাতের কাজের শাড়ি করবো। যেভাবা সেই কাজ আমরা চারজনে মিলে নয়টা শাড়ি উঠাই এবং শাড়ি গুলো আমরা বিভিন্ন জায়গায় দেখিয়েছি বিভিন্ন দোকানে, অবশেষে একটি দোকানে আমাদের শাড়িটা খুব পছন্দ করে এবং তারা হচ্ছে আমাদেরকে প্রতি পিসের জন্য ১০ টা করে অর্ডার দেন কারণ সামনে ঈদ,মানুষ চারজন কাজের জন্য এমনভাবে কাজ করার জন্য লোকও পেলাম না অবশেষে আমাদের সে অর্ডারটা ক্যানসেল করতে হয় ভীষণ মন খারাপ হয় একসময় ভেঙে পরি বাদ দিয়ে দেওয়া হয় সেই কাজ।
তারপরে মেয়ে হল আবারো স্কুলে জয়েন করি তখন টুকিটাকি টেইলারিং এর কাজ করতাম, বাচ্চা পড়াতাম।
সে সময় আবার আরেকটা কাজ শিখে নিয়েছিলাম সেটি হচ্ছে বেতি দিয়ে যে ব্যাগ তৈরির কাজটা শিখেছিলাম, তখন টেইলারিং এর সাথে ব্যাগ তৈরির কাজটা করতাম।
কিন্তু যখন ছেলে হলো তখন হচ্ছে স্কুলের চাকরি আর এই ব্যাগের কাজ বন্ধ হয়ে গেলো, কারণ ছেলেকে সামলানোটা এবং এগুলো করাটা ছিল ভীষণ চাপের।
যাইহোক ছেলে যখন একটু বড় হল তখন শুরু করলাম সেই টেইলারিং এর কাজটাই আস্তে আস্তে এলাকার মধ্যে একটা পরিচিতি ছড়ালো,অনেকে নললো আপনি যেহেতু সেলাই এর কাজটা করেন আপনি কিছু ড্রেসও আনতে পারেন আমরা আপনার কাছ থেকেই ড্রেস নিয়ে আপনার কাছে সেলাই করবো।
কথাটা ভালো লাগলো নিজের কাছে কিছু জমানো টাকা ছিল পনেরো হাজার টাকার মতন সেলাই এবং বাচ্চা পড়াতাম সেগুলোর।
সেই টাকা নিয়েই শুরু হলো আমার ছোট্ট করে এক বিজনেস। সেলাই করাটা সবাই মেনে নিলো বিজনেসটা পরিবারের কেউ মেনে নিতে চাইনি কারণ ছিল বাইরে যেতে হবে ড্রেস কিনতে হবে সেগুলো আনা এগুলো হচ্ছে সমস্যা, বিশেষ করে আমার হাজবেন্ডের জন্য একদমই অপছন্দনীয়।
এটা নিয়ে একসময় অনেক সমস্যা হতো কিন্তু দাঁতে দাঁত লাগিয়ে চেপে থাকতাম ধরে রেখেছিলাম যেটা আগে করতে পারিনি ছেড়ে দিয়েছিলাম কিন্তু এখন আর ছাড়িনি।
আস্তে আস্তে নিজের ব্যবসাটা এখন বড় করলাম।। নিজে টেইলারিং এর প্রশিক্ষণ দেই এবং তার সাথে ব্লক বাটিক এবং গহনা তৈরীর কাজটাও শিখে নিয়েছিলাম।।
টেলারিং এর সুবিধায় অনেকে আমার কাছে আসতো অনেক সমস্যার কথা শেয়ার করতো।তাদের কষ্টের কথাগুলো শুনে মনে হল যে তাদের জন্য কিছু করা দরকার। তাই কয়েকজনকে নিয়ে মিটিং করি তারা যে যে কাজগুলো জানতো এগুলো নিয়ে যাতে এগিয়ে যেতে পারে সে চেষ্টা করলাম।
যারা কুশি কাটার কাজ জানে তাদের দিয়ে কুশিকাটার কাজ করাই, যারা গহনা তৈরি করতে জানে তাদের দিয়ে সেটা করাই, যারা টেইলারিংয়ের কাজ জানে তাদের সেটার জন্য রেখে দিয়েছি আমার কাছে।
এভাবে আমার এখানে প্রায় ৯ থেকে ১০ জন লোক আছে।
আমি চাই সমাজের মেয়েরা, নিজের পায়ে দাঁড়াক নিজের পায়ের মাটিটা যাতে শক্ত করতে পারে।
আমি যে পণ্য নিয়ে কাজ করি, আমি সেগুলো সমসাময়িকভাবে করে থাকি,যখন যেমন ড্রেস দরকার সেই অনুযায়ী আমি আমার ড্রেস নিয়ে আসি।
একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং পারিবারিক চ্যালেঞ্জ ও মানসিক চাপ টাতো থাকেই।
এমন অনেক মেয়েরা আছে যাদের পরিবার থেকে অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য করে না সেই ক্ষেত্রে তার মানসিক চাপটা অনেকটা বেড়ে যায়।।
আমার পেজটাকে আলাদা করার সবচেয়ে বড় বিষয়টা হচ্ছে আমার ড্রেসের ফিনিশিং এবং আমার কাস্টমাইজট করাটা,যেটা সবাই ভীষণ পছন্দ করে এবং সাথে আমি আমার গহনায় ঐতিহ্যের ছাপটা সব সময় রেখে দেওয়ার চেষ্টা করি।
একজন মেয়ে হিসেবে যেমন সংসারটা সামলাতে হবে সেভাবে আমাকে আমার বিজনেসটাও সামলাতে হবে, আগে আমি আমার পরিবারটাকে প্রাধান্য দেই এবং যখন কাজের চাপ থাকে আমি সেটাকে মানিয়ে নেওয়া চেষ্টা করি, আমি রাতে রান্না করি এবং দিনের বেলা আমি আমার ব্যবসার কাজটাই বেশি করি।
আমার কাজে সব সময় আমাকে সাপোর্ট করেছে আমার মা আমার বোন পরবর্তীতে আমার হাজবেন্ডও আমাকে অনেক সাপোর্ট করেছে যদি দু একটা বিষয় তার অপছন্দনীয় তারপরও সেটা মানিয়ে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।
এমন অনেক মুহূর্ত আসছে যখন মনে হয়েছে ছেড়ে দেই সহ্য হচ্ছে না, আর পারছি না, বিশেষ করে যখন হচ্ছে মার্কেট থেকে মাল আনতে হয় ঈদের কেনাকাটার সময় প্রচুর মাল আনতে হয় একটা মেয়ে মালগুলোকে আনা দোকান দোকানে রেখে আসা এবং একসাথে সেগুলো গাড়িতে উঠানো এবং দোকানে নিয়ে আসা, যখন এই মালগুলো টানতে হয় তখন আসলে ভীষণ কষ্ট হয়। কেননা এক্ষেত্রে আমি আমার হাজব্যান্ডকে পাইনা।
এবং অনেক সময় দেখা যায় কাজের ভীষণ চাপ থাকে কিন্তু নিজের শরীরটা সায় দিচ্ছেনা, তখন মনে হয় এত কাজ করে কি হবে ছেড়ে দেই।
কিন্তু না ছেড়ে দিলে তো নিজের পরিচয়টা তৈরি করা যাবে না, যত কষ্টই হোক নিজের একটা পরিচয় তৈরি করতে হবে।
যারা ঘরে বসে কাজ জানে কিন্তু সাহস পায় না তাদের জন্য আমি এটুকুই বলতে চাই সাহস কেউ আপনাকে দেবে না আপনার সাহসটা আপনাকেই করে নিতে হবে। যখন আপনি সফল হবেন তখন সকলকেই আপনি পাবেন।

